লূকলিখিত

সুসমাচার

1

যীশুর জীবন সম্পর্কে লূকের লেখা

1মাননীয় থিয়ফিল,

আমাদের মধ্যে যে সব ঘটনা ঘটেছে সেগুলির বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্য বহু ব্যক্তি চেষ্টা করেছেন। 2তাঁরা সেই একই বিষয় লিখেছেন, যা আমরা জেনেছি তাঁদের কাছ থেকে, যাঁরা প্রথম থেকে নিজেদের চোখে দেখেছেন এবং এই বার্তা ঘোষণা করেছেন। 3তাই আমার মনে হল যে যখন আমি সেই সব বিষয় প্রথম থেকে ভালভাবে খোঁজ খবর নিয়েছি তখন তা সুন্দরভাবে গুছিয়ে লিখি। 4যার ফলে আপনি জানবেন, যে বিষয়গুলি আপনাকে জানানো হয়েছে সেগুলি সত্য।

সখরিয় ও ইলীশাবেৎ

5যিহূদিয়ার রাজা হেরোদের সময়ে সখরিয় নামে একজন যাজক ছিলেন। ইনি ছিলেন অবিয়ের দলের+ 1:5 অবিয়ের দল ইহুদী যাজকরা 24 টি দলে বিভক্ত ছিল। দ্রষ্টব্য 1 বংশাবলি 24. যাজকদের একজন। সখরিয়র স্ত্রী ইলীশাবেৎ ছিলেন হারোণের বংশধর। 6তাঁরা উভয়েই ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ধার্মিক ছিলেন। প্রভুর সমস্ত আদেশ ও বিধি-ব্যবস্থা তাঁরা নিখুঁতভাবে পালন করতেন। 7ইলীশাবেৎ বন্ধ্যা হওয়ার দরুন তাঁদের কোন সন্তান হয় নি। তাঁদের উভয়েরই অনেক বয়স হয়ে গিয়েছিল।

8একবার তাঁর দলের যাজকদের ওপর দায়িত্বভার পড়েছিল, তখন সখরিয় যাজক হিসেবে মন্দিরে ঈশ্বরের সেবা করছিলেন। 9যাজকদের কার্য প্রণালী অনুযায়ী তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছিল যেন তিনি মন্দিরের মধ্যে গিয়ে প্রভুর সামনে ধূপ জ্বালাতে পারেন। 10ধূপ জ্বালাবার সময় বাইরে অনেক লোক জড় হয়ে প্রার্থনা করছিল।

11এমন সময় প্রভুর এক স্বর্গদূত সখরিয়র সামনে উপস্থিত হয়ে ধূপবেদীর ডানদিকে দাঁড়ালেন। 12সখরিয় সেই স্বর্গদূতকে দেখে চমকে উঠলেন এবং খুব ভয় পেলেন। 13কিন্তু স্বর্গদূত তাঁকে বললেন, “সখরিয় ভয় পেও না, কারণ তুমি যে প্রার্থনা করেছ, ঈশ্বর তা শুনেছেন। তোমার স্ত্রী ইলীশাবেতের একটি পুত্র সন্তান হবে, তুমি তার নাম রাখবে যোহন। 14সে তোমার জীবনে আনন্দ ও সুখের কারণ হবে, তার জন্মের দরুণ আরো অনেকে আনন্দিত হবে। 15কারণ প্রভুর দৃষ্টিতে যোহন হবে এক মহান ব্যক্তি। সে অবশ্যই দ্রাক্ষারস বা নেশার পানীয় গ্রহণ করবে না। জন্মের সময় থেকেই যোহন পবিত্র আত্মায় পূর্ণ হবে।

16“ইস্রায়েলীয়দের অনেক লোককেই সে তাদের প্রভু ঈশ্বরের পথে ফেরাবে। 17যোহন এলিয়ের+ 1:17 এলিয় ইনি খ্রীষ্ট পূর্ব 850 সালের একজন ভাববাদী। আত্মায় ও শক্তিতে প্রভুর আগে চলবে। সে পিতাদের মন তাদের সন্তানদের দিকে ফেরাবে, আর অধার্মিকদের মনের ভাব বদলে ধার্মিক লোকদের মনের ভাবের মতো করবে। প্রভুর জন্য সে এইভাবে লোকদের প্রস্তুত করবে।”

18তখন সখরিয় সেই স্বর্গদূতকে বললেন, “আমি কিভাবে জানব যে সত্যিই এসব হবে? কারণ আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছি, আর আমার স্ত্রীরও অনেক বয়স হয়ে গেছে।”

19এর উত্তরে স্বর্গদূত তাঁকে বললেন, “আমি গাব্রিয়েল, ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি; আর তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য ও তোমাকে এই সুখবর দেবার জন্যই আমাকে পাঠানো হয়েছে। 20কিন্তু জেনে রেখো! এইসব ঘটনা ঘটা পর্যন্ত তুমি বোবা হয়ে থাকবে, কথা বলতে পারবে না, কারণ তুমি আমার কথা বিশ্বাস করলে না, কিন্তু আমার এইসব কথা নিরুপিত সময়েই পূর্ণ হবে।”

21এদিকে বাইরে লোকেরা সখরিয়র জন্য অপেক্ষা করছিল, তিনি এতক্ষণ পর্যন্ত মন্দিরের মধ্যে কি করছেন একথা ভেবে তারা অবাক হচ্ছিল। 22পরে তিনি যখন বেরিয়ে এলেন, তখন লোকদের সঙ্গে কথা বলতে পারলেন না, এতে লোকেরা বুঝতে পারল মন্দিরের মধ্যে তিনি নিশ্চয়ই কোন দর্শন পেয়েছেন। তিনি লোকদের ইশারায় তাঁর বক্তব্য বোঝাতে লাগলেন, কিন্তু কোনরকম কথা বলতে পারলেন না। 23এরপর দৈনিক সেবাকার্য্যের শেষে তিনি তাঁর বাড়ি ফিরে গেলেন।

24এর কিছুক্ষণ পরে তাঁর স্ত্রী ইলীশাবেৎ গর্ভবতী হলেন; আর পাঁচ মাস পর্যন্ত লোক সাক্ষাতে বার হলেন না। তিনি বলতেন, 25“এখন প্রভুই এইভাবে আমায় সাহায্য করেছেন! সমাজে আমার যে লজ্জা ছিল, কৃপা করে এখন এইভাবে তিনি তা দূর করে দিলেন।”

কুমারী মরিয়ম

26 ইলীশাবেৎ যখন ছমাসের গর্ভবতী, তখন ঈশ্বর গাব্রিয়েল, স্বর্গদূতকে গালীলে নাসরৎ নগরে এক কুমারীর কাছে পাঠালেন। এই কুমারী ছিলেন যোষেফ নামে এক ব্যক্তির বাগদত্তা। যোষেফ ছিলেন রাজা দায়ূদের বংশধর, আর যে কুমারীর কাছে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল তাঁর নাম মরিয়ম। 28গাব্রিয়েল মরিয়মের কাছে এসে বললেন, “তোমার মঙ্গল হোক্! প্রভু তোমার প্রতি মুখ তুলে চেয়েছেন, তিনি তোমার সঙ্গে আছেন।”

29এই কথা শুনে মরিয়ম খুবই বিচলিত ও অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন, “এ কেমন শুভেচ্ছা?”

30স্বর্গদূত তাঁকে বললেন, “মরিয়ম তুমি ভয় পেও না, কারণ ঈশ্বর তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। 31শোন! তুমি গর্ভবতী হবে আর তোমার এক পুত্র সন্তান হবে। তুমি তাঁর নাম রাখবে যীশু। 32তিনি হবেন মহান, তাঁকে পরমেশ্বরের পুত্র বলা হবে, আর প্রভু ঈশ্বর তাঁর পিতৃপুরুষ রাজা দায়ূদের সিংহাসন তাঁকে দেবেন। 33তিনি যাকোবের বংশের লোকদের ওপরে চিরকাল রাজত্ব করবেন, তাঁর রাজত্বের কখনও শেষ হবে না।”

34তখন মরিয়ম স্বর্গদূতকে বললেন, “কেমন করে সম্ভব? কারণ আমি তো কুমারী!”

35এর উত্তরে স্বর্গদূত বললেন, “পবিত্র আত্মা+ 1:35 পবিত্র আত্মা যাঁকে ঈশ্বরের আত্মা, খ্রীষ্টের আত্মা ও সহায়ক বলা হয়ে থাকে। তোমার ওপর অধিষ্ঠান করবেন আর পরমেশ্বরের শক্তি তোমাকে আবৃত করবে; তাই যে পবিত্র শিশুটি জন্মগ্রহণ করবে তাঁকে ঈশ্বরের পুত্র বলা হবে। 36আর শোন, তোমার আত্মীয়া ইলীশাবেৎ যদিও এখন অনেক বৃদ্ধা তবু সে গর্ভে পুত্রসন্তান ধারণ করছে। এই স্ত্রীলোকের বিষয়ে লোকে বলত যে তার কোন সন্তান হবে না, কিন্তু সে এখন ছমাসের গর্ভবতী। 37কারণ ঈশ্বরের পক্ষে কোন কিছুই অসাধ্য নয়!”

38মরিয়ম বললেন, “আমি প্রভুর দাসী। আপনি যা বলেছেন আমার জীবনে তাই হোক্!” এরপর স্বর্গদূত মরিয়মের কাছ থেকে চলে গেলেন।

সখরিয় ও ইলীশাবেতের সঙ্গে মরিয়মের সাক্ষাৎ

39তখন মরিয়ম উঠে তাড়াতাড়ি করে যিহূদার পার্বত্য অঞ্চলের একটি নগরে গেলেন। 40সেখানে সখরিয়র বাড়িতে গিয়ে ইলীশাবেতকে অভিবাদন জানালেন। 41ইলীশাবেৎ যখন মরিয়মের সেই অভিবাদন শুনলেন, তখনই তাঁর গর্ভের সন্তানটি আনন্দে নেচে উঠল; আর ইলীশাবেৎ পবিত্র আত্মাতে পূর্ণ হলেন।

42এরপর তিনি খুব জোরে জোরে বলতে লাগলেন, “সমস্ত স্ত্রীলোকের মধ্যে তুমি ধন্যা, আর তোমার গর্ভে যে সন্তান আছেন তিনি ধন্য। 43কিন্তু আমার প্রভুর মা যে আমার কাছে এসেছেন, এমন সৌভাগ্য আমার কি করে হল? 44কারণ যে মুহূর্তে তোমার কন্ঠস্বর আমি শুনলাম, আমার গর্ভের শিশুটি তখনই নড়ে উঠল। 45আর তুমি ধন্যা, কারণ তুমি বিশ্বাস করেছ যে প্রভু তোমায় যা বলেছেন তা পূর্ণ হবে।”

মরিয়ম ঈশ্বরের প্রশংসা করলেন

46তখন মরিয়ম বললেন,

47“আমার আত্মা প্রভুর প্রশংসা করছে,

আর আমার আত্মা আমার ত্রাণকর্তা ঈশ্বরকে পেয়ে আনন্দিত।

48কারণ তাঁর এই তুচ্ছ দাসীর দিকে

তিনি মুখ তুলে চেয়েছেন।

হ্যাঁ, এখন থেকে সকলেই

আমাকে ধন্যা বলবে।

49কারণ সেই একমাত্র সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আমার জীবনে কত না মহত্ কাজ করেছেন।

পবিত্র তাঁর নাম।

50আর যাঁরা বংশানুক্রমে তাঁর উপাসনা করে

তিনি তাদের দয়া করেন।

51তাঁর বাহুর যে পরাক্রম, তা তিনি দেখিয়েছেন।

যাদের মন অহঙ্কার ও দম্ভপূর্ণ চিন্তায় ভরা, তাদের তিনি ছিন্নভিন্ন করে দেন।

52তিনিই শাসকদের সিংহাসনচ্যুত করেন,

যারা নতনম্র তাদের উন্নত করেন।

53ক্ষুধার্তকে তিনি উত্তম দ্রব্য দিয়ে তৃপ্ত করেন;

আর বিত্তবানকে নিঃস্ব করে বিদায় করেন।

54তিনি তাঁর দাস ইস্রায়েলকে সাহায্য করতে এসেছেন।

55যেমন তিনি আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি তেমনই করবেন।

অব্রাহাম ও তাঁর বংশের লোকদের চিরকাল দয়া করার কথা তিনি মনে রেখেছেন।”

56ইলীশাবেতের ঘরে মরিয়ম প্রায় তিন মাস থাকলেন। পরে তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন।

যোহনের জন্ম

57ইলীশাবেতের প্রসবের সময় হলে তিনি একটি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। 58তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা যখন শুনল যে প্রভু তাঁর প্রতি কি মহা দয়া করেছেন, তখন তারা তাঁর আনন্দে আনন্দিত হল।

59শিশুটি যখন আট দিনের, সেই সময় তাঁরা শিশুটিকে নিয়ে সুন্নত করাতে এলেন। সবাই শিশুটির বাবার নাম অনুসারে শিশুর নাম সখরিয় রাখার কথা চিন্তা করছিলেন। 60কিন্তু তার মা বলে উঠলেন, “না! ওর নাম হবে যোহন।”

61তখন তাঁরা ইলীশাবেতকে বললেন, “আপনার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে তো কারও ঐ নাম নেই!” 62এরপর তারা ইশারা করে ছেলেটির বাবার কাছে জানতে চাইলেন তিনি কি নাম দিতে চান।

63সখরিয় ইশারা করে লেখার ফলক চেয়ে নিলেন ও তাতে লিখলেন, “ওর নাম যোহন।” এতে তাঁরা সকলে আশ্চর্য হয়ে গেলেন, 64তখনই সখরিয়র জিভের জড়তা চলে গেল ও মুখ খুলে গেল, আর তিনি ঈশ্বরের প্রশংসা করতে লাগলেন। 65আশপাশের সকলে এতে খুব ভয় পেয়ে গেল, যিহূদিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের লোকরা সকলে এবিষয়ে বলাবলি করতে লাগল। 66যারা এসব কথা শুনল তারা সকলেই আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল, “ভবিষ্যতে এই ছেলেটি কি হবে? কারণ প্রভুর শক্তি এর সঙ্গে আছে।”

সখরিয় ঈশ্বরের প্রশংসা করলেন

67পরে ছেলেটির বাবা সখরিয় পবিত্র আত্মায় পূর্ণ হয়ে ভাববাণী বলতে লাগলেন:

68“ইস্রায়েলের প্রভু ঈশ্বরের প্রশংসা হোক্,

কারণ তিনি তাঁর নিজের লোকদের সাহায্য করতে

ও তাদের মুক্ত করতে এসেছেন।

69আমাদের জন্য তিনি তাঁর দাস দায়ূদের বংশে

একজন মহাশক্তিসম্পন্ন ত্রাণকর্তাকে দিয়েছেন।

70এ বিষয়ে তাঁর পবিত্র ভাববাদীদের+ 1:70 ভাববাদী ভাববাদীরা ঈশ্বরের পক্ষে কথা বলতেন এবং প্রায়ই ভবিষ্যতে কি ঘটবে তার পূর্বাভাস দিতেন। মাধ্যমে

তিনি বহুপূর্বেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

71শত্রুদের হাত থেকে ও যারা আমাদের ঘৃণা করে

তাদের কবল থেকে উদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি।

72তিনি বলেছিলেন, আমাদের পিতৃপুরুষদের প্রতি দয়া করবেন

এবং তিনি সেই প্রতিশ্রুতি স্মরণে রেখেছেন।

73এ সেই প্রতিশ্রুতি যা তিনি আমাদের পিতৃপুরুষ অব্রাহামের কাছে করেছিলেন।

74শত্রুদের হাত থেকে আমাদের উদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি

যেন আমরা নির্ভয়ে তাঁর সেবা করতে পারি:

75আর আমাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টিতে পবিত্র ও ধার্মিক থেকে তাঁর সেবা করে যেতে পারি।

76“এখন হে বালক, তোমাকে বলা হবে পরমেশ্বরের ভাববাদী;

কারণ তুমি প্রভুর পথ প্রস্তুত করবার জন্য তাঁর আগে আগে চলবে।

77তুমি তাঁর লোকদের বলবে, ঈশ্বরের দয়ায়

তোমরা পাপের ক্ষমা দ্বারা উদ্ধার পাবে।

78“কারণ আমাদের ঈশ্বরের দয়া ও করুণার উর্দ্ধ থেকে

এক নতুন দিনের ভোরের আলো আমাদের ওপর ঝরে পড়বে।

79যারা অন্ধকার ও মৃত্যুর ছায়ায় বসে আছে তাদের ওপর সেই আলো এসে পড়বে;

আর তা আমাদের শান্তির পথে পরিচালিত করবে।”

80সেই শিশু যোহন বড় হয়ে উঠতে লাগলেন, আর দিন দিন আত্মায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকলেন। ইস্রায়েলীয়দের কাছে প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসার আগে পর্যন্ত তিনি নির্জন স্থানগুলিতে জীবনযাপন করছিলেন।

2

যীশুর জন্ম

(মথি 1:18-25)

1সেই সময় আগস্ত কৈসর হুকুম জারি করলেন যে, রোম সাম্রাজ্যের সব জায়গায় লোক গণনা করা হবে। 2এটাই হল সুরিয়ার রাজ্যপাল কুরীণিয়ের সময়ে প্রথম আদমশুমারি। 3আর প্রত্যেকে নিজের নিজের শহরে নাম লেখাবার জন্য গেল।

4যোষেফ ছিলেন রাজা দায়ূদের বংশধর, তাই তিনি গালীল প্রদেশের নাসরৎ থেকে রাজা দায়ূদের বাসভূমি বৈৎলেহমে গেলেন। 5যোষেফ তাঁর বাগ্দত্তা স্ত্রী মরিয়মকে সঙ্গে নিয়ে নাম লেখাতে চললেন। এই সময় মরিয়ম ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। 6তাঁরা যখন সেখানে ছিলেন, তখন মরিয়মের প্রসব বেদনা উঠল। 7আর মরিয়ম তাঁর প্রথম সন্তান প্রসব করলেন। তিনি সদ্যোজাত সেই শিশুকে কাপড়ের টুকরো দিয়ে জড়িয়ে একটি জাবনা খাবার পাত্রে শুইয়ে রাখলেন, কারণ ঐ নগরের অতিথিশালায় তাঁদের জন্য জায়গা ছিল না।

মেষপালকরা যীশুর সম্পর্কে শুনলেন

8সেখানে গ্রামের বাইরে মেষপালকরা রাতে মাঠে তাদের মেষপাল পাহারা দিচ্ছিল। 9এমন সময় প্রভুর এক স্বর্গদূত তাদের সামনে উপস্থিত হলে প্রভুর মহিমা চারদিকে উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিল। এই দেখে মেষপালকরা খুব ভয় পেয়ে গেল। 10সেই স্বর্গদূত তাদের বললেন, “ভয় নেই, দেখ আমি তোমাদের কাছে এক আনন্দের সংবাদ নিয়ে এসেছি। এই সংবাদ সকলের জন্য মহা আনন্দের হবে। 11কারণ রাজা দায়ূদের নগরে আজ তোমাদের জন্য একজন ত্রাণকর্তার জন্ম হয়েছে। তিনি খ্রীষ্ট প্রভু। 12আর তোমাদের জন্য এই চিহ্ন রইল, তোমরা দেখবে একটি শিশুকে কাপড়ে জড়িয়ে একটা জাবনা খাবার পাত্রে শুইয়ে রাখা হয়েছে।”

13সেই সময় হঠাৎ‌ স্বর্গীয় বাহিনীর এক বিরাট দল ঐ স্বর্গদূতদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ঈশ্বরের প্রশংসা করতে করতে বললেন,

14“স্বর্গে ঈশ্বরের মহিমা,

পৃথিবীতে তাঁর প্রীতির পাত্র মনুষ্যদের মধ্যে শান্তি।”

15স্বর্গদূতরা তাদের কাছ থেকে স্বর্গে ফিরে গেলে মেষপালকরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, “চল, আমরা বৈৎলেহমে যাই, প্রভু আমাদের যে ঘটনার কথা জানালেন সেখানে গিয়ে তা দেখি।”

16তারা সেখানে ছুটে গেলে মরিয়ম, যোষেফ এবং সেই শিশুটিকে একটি জাবনা খাবার পাত্রে শোওয়া অবস্থায় দেখল। 17মেষপালকেরা শিশুটিকে দেখতে পেয়ে, সেই শিশুটির বিষয়ে তাদের যা বলা হয়েছিল সেকথা সকলকে জানাল। 18মেষপালকদের মুখে ঐ কথা যারা শুনল তারা সকলে আশ্চর্য হয়ে গেল। 19কিন্তু মরিয়ম এই কথা মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে সব সময় এবিষয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। 20এরপর মেষপালকরা তাদের কাছে যা বলা হয়েছিল সেই অনুসারে সব কিছু দেখে ও শুনে ঈশ্বরের প্রশংসা করতে করতে ঘরে ফিরে গেল।

21এর আট দিন পরে সুন্নত করার সময়ে শিশুটির নাম রাখা হল যীশু। মাতৃগর্ভে আসার আগেই স্বর্গদূত তাঁর এই নাম রেখেছিলেন।

যীশুকে মন্দিরে আনা হল

22মোশির বিধি-ব্যবস্থা অনুসারে শুচিকরণ অনুষ্ঠানের সময় হলে তাঁরা যীশুকে জেরুশালেমে নিয়ে গেলেন, যেন সেখানে প্রভুর সামনে তাঁকে উৎসর্গ করতে পারেন। 23কারণ প্রভুর বিধি-ব্যবস্থায় লেখা আছে, “স্ত্রীলোকের প্রথম সন্তানটি যদি পুত্র হয়, তবে তাকে ‘প্রভুর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে হবে,’”+ 2:23 স্ত্রীলোকের … হবে দ্রষ্টব্য যাত্রা. 13:2, 12.24আর প্রভুর বিধি-ব্যবস্থা অনুসারে, “এক জোড়া ঘুঘু অথবা দুটি পায়রার বাচ্চা উৎসর্গ করতে হবে।”+ 2:24 উদ্ধৃতি লেবীয় 12:8. সুতরাং যোষেফ এবং মরিয়ম সেইমত কাজ করবার জন্য জেরুশালেমে গেলেন।

শিমিয়োন যীশুকে দেখলেন

25জেরুশালেমে সেই সময় শিমিয়োন নামে একজন ধার্মিক ও ঈশ্বরভক্ত লোক বাস করতেন। তিনি ইস্রায়েলের মুক্তির অপেক্ষায় ছিলেন। পবিত্র আত্মা তাঁর ওপর অধিষ্ঠান করছিলেন। 26পবিত্র আত্মার মাধ্যমে তাঁর কাছে একথা প্রকাশ করা হয়েছিল যে প্রভু খ্রীষ্টকে না দেখা পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হবে না। 27পবিত্র আত্মার প্রেরণায় তিনি সেদিন মন্দিরে এসেছিলেন। যীশুর বাবা-মা মোশির বিধি-ব্যবস্থা পালন করতে যীশুকে নিয়ে সেখানে এলেন। 28তখন শিমিয়োন যীশুকে কোলে তুলে নিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন,

29“হে প্রভু, তোমার প্রতিশ্রুতি অনুসারে তুমি তোমার দাসকে শান্তিতে বিদায় দাও।

30কারণ আমি নিজের চোখে তোমার পরিত্রাণ দেখেছি।

31যে পরিত্রাণ তুমি সকল লোকের সাক্ষাতে প্রস্তুত করেছ।

32তিনি অইহুদীদের অন্তর আলোকিত করার জন্য আলো;

আর তিনিই তোমার প্রজা ইস্রায়েলের জন্য সম্মান আনবেন।”

33তাঁর বিষয়ে যা বলা হল তা শুনে যোষেফ ও মরিয়ম আশ্চর্য হয়ে গেলেন। 34এরপর শিমিয়োন তাঁদের আশীর্বাদ করে যীশুর মা মরিয়মকে বললেন, “ইনি হবেন ইস্রায়েলের মধ্যে বহু লোকের পতন ও উত্থানের কারণ। ঈশ্বর হতে আগত এমন চিহ্ন যা বহু লোকই অগ্রাহ্য করবে। 35এতে বহু লোকের হৃদয়ের গোপন চিন্তা প্রকাশ হয়ে পড়বে। যা যা ঘটবে তাতে তোমার হৃদয় বিদীর্ণ হবে।”

হান্না যীশুকে দেখলেন

36সেখানে হান্না নামে একজন ভাববাদিনী ছিলেন। তিনি আশের গোষ্ঠীর পনুয়েলের কন্যা। তাঁর অনেক বয়স হয়েছিল। বিবাহের পর সাত বছর তিনি স্বামীর ঘর করেন, 37তারপর চুরাশি বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বৈধব্য জীবনযাপন করেছিলেন। মন্দির ছেড়ে তিনি কোথাও যেতেন না; উপবাস ও প্রার্থনাসহ সেখানে দিন-রাত ঈশ্বরের উপাসনা করতেন।

38ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি তাঁদের দিকে এগিয়ে এসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে আরম্ভ করলেন; আর যারা জেরুশালেমের মুক্তির অপেক্ষায় ছিল তাদের সকলের কাছে সেই শিশুটির বিষয় বলতে লাগলেন।

যোষেফ ও মরিয়মের গৃহে প্রত্যাবর্তন

39প্রভুর বিধি-ব্যবস্থা অনুসারে যা যা করণীয় তা সম্পূর্ণ করে যোষেফ ও মরিয়ম তাঁদের নিজেদের নগর নাসরতে ফিরে গেলেন। 40শিশুটি ক্রমে ক্রমে বেড়ে উঠতে লাগলেন ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। তিনি জ্ঞানে পূর্ণ হতে থাকলেন, তাঁর ওপরে ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছিল।

বালক যীশু

41নিস্তারপর্ব+ 2:41 নিস্তারপর্ব ইহুদীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র দিন। এই দিন তাঁরা বিশেষভাবে প্রস্তুত খাবার খেতেন এবং তার মাধ্যমে ঈশ্বর মোশির সময়ে যেভাবে তাদের মিশরের বন্দীদশা থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন তা স্মরণ করতেন। পালনের জন্য তাঁর মা-বাবা প্রতি বছর জেরুশালেমে যেতেন। 42যীশুর বয়স যখন বারো বছর, তখন তাঁরা যথারীতি সেই পর্বে যোগ দিতে গেলেন। 43পর্বের শেষে তাঁরা যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন বালক যীশু জেরুশালেমেই রয়ে গেলেন, এবিষয়ে তাঁর মা-বাবা কিছুই জানতে পারলেন না। 44তাঁরা মনে করলেন যে তিনি দলের সঙ্গেই আছেন। তাঁরা এক দিনের পথ চলার পর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে তাঁর খোঁজ করতে লাগলেন। 45কিন্তু তাঁকে না পেয়ে তাঁরা যীশুর খোঁজ করতে করতে আবার জেরুশালেমে ফিরে গেলেন।

46শেষ পর্যন্ত তিন দিন পরে মন্দির চত্বরে তাঁর দেখা পেলেন। সেখানে তিনি ধর্ম শিক্ষকদের সাথে বসে তাঁদের কথা শুনছিলেন ও তাঁদের নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছিলেন। 47যাঁরা তাঁর কথা শুনছিলেন তাঁরা সকলে যীশুর বুদ্ধি আর প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া দেখে অবাক হয়ে গেলেন। 48যীশুর মা-বাবা তাঁকে সেখানে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তাঁর মা তাঁকে বললেন, “বাছা, তুমি আমাদের সঙ্গে কেন এমন করলে? তোমার বাবা ও আমি ভীষণ ব্যাকুল হয়ে তোমার খোঁজ করে বেড়াচ্ছি।”

49যীশু তখন তাঁদের বললেন, “তোমরা কেন আমার খোঁজ করছিলে? তোমরা কি জানতে না যে যেখানে আমার পিতার কাজ, সেখানেই আমাকে থাকতে হবে?” 50কিন্তু তিনি তাঁদের যা বললেন তার অর্থ তাঁরা বুঝতে পারলেন না।

51এরপর তিনি তাঁদের সঙ্গে নাসরতে ফিরে গেলেন, আর তাঁদের বাধ্য হয়ে রইলেন। তাঁর মা এসব কথা মনের মাঝে গেঁথে রাখলেন। 52এইভাবে যীশু বয়সে ও জ্ঞানে বড় হয়ে উঠলেন, আর ঈশ্বর ও মানুষের ভালবাসা লাভ করলেন।

3

যোহনের প্রচার

(মথি 3:1-12; মার্ক 1:1-8; যোহন 1:19-28)

1তিবিরিয় কৈসরের রাজত্বের পনের বছরের মাথায়

যিহূদিয়ার রাজ্যপাল ছিলেন পন্তীয় পীলাত।

সেই সময় হেরোদ ছিলেন গালীলের শাসনকর্তা

এবং তাঁর ভাই ফিলিপ ছিলেন যিতুরিয়া ও ত্রাখোনীতিয়ার শাসনকর্তা,

লুষাণিয় ছিলেন অবিলীনীর শাসনকর্তা।

2হানন ও কায়াফা ছিলেন ইহুদীদের মহাযাজক। সেই সময় প্রান্তরের মধ্যে সখরিয়র পুত্র যোহনের কাছে ঈশ্বরের আদেশ এল। 3আর তিনি যর্দনের চারপাশে সমস্ত জায়গায় গিয়ে প্রচার করতে লাগলেন যেন লোকে পাপের ক্ষমা লাভের জন্য মন ফেরায় ও বাপ্তিস্ম নেয়। 4ভাববাদী যিশাইয়র পুস্তকে যেমন লেখা আছে:

“প্রান্তরের মধ্যে একজনের কন্ঠস্বর ডেকে ডেকে বলছে,

‘প্রভুর জন্য পথ প্রস্তুত কর।

তাঁর জন্য চলার পথ সোজা কর।

5সমস্ত উপত্যকা ভরাট কর,

প্রতিটি পর্বত ও উপপর্বত সমান করতে হবে।

আঁকা-বাঁকা পথ সোজা করতে হবে

এবং এবড়ো-খেবড়ো পথ সমান করতে হবে।

6তাতে সকল লোকে ঈশ্বরের পরিত্রাণ দেখতে পাবে।’”+ 3:6 উদ্ধৃতি যিশাইয় 40:3-5.

7তখন বাপ্তিস্ম নেবার জন্য অনেক লোক যোহনের কাছে আসতে লাগল। তিনি তাদের বললেন, “হে সাপের বংশধরেরা! ঈশ্বরের কাছ থেকে যে ক্রোধ নেমে আসছে তা থেকে বাঁচার জন্য কে তোমাদের সতর্ক করে দিল? 8তোমরা যে মন ফিরিয়েছ তার ফল দেখাও। একথা বলতে শুরু করো না, যে ‘আরে অব্রাহাম তো আমাদের পিতৃপুরুষ’ কারণ আমি তোমাদের বলছি এই পাথরগুলো থেকে ঈশ্বর অব্রাহামের জন্য সন্তান উৎপন্ন করতে পারেন। 9গাছের গোড়াতে কুড়ুল লাগানোই আছে, যে গাছ ভাল ফল দিচ্ছে না তা কেটে আগুনে ফেলে দেওয়া হবে।”

10তখন লোকরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমাদের কি করতে হবে?”

11এর উত্তরে তিনি তাদের বললেন, “যদি কারো দুটো জামা থাকে, তবে যার নেই তাকে যেন তার থেকে একটি জামা দেয়; আর যার খাবার আছে, সেও অন্যের সঙ্গে সেইরকম যেন ভাগ করে নেয়।”

12কয়েকজন কর আদায়কারীও বাপ্তাইজ+ 3:12 বাপ্তাইজ এটি একটি গ্রীক শব্দ, যার অর্থ হল কোন ব্যক্তিকে অল্প সময়ের জন্য জলে ডোবানো। হবার জন্য এল। তারা তাঁকে বলল, “গুরু, আমরা কি করব?”

13তখন তিনি তাদের বললেন, “যতটা কর আদায় করার কথা তার চেয়ে বেশী আদায় কোরো না।”

14কয়েকজন সৈনিকও তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের কি হবে? আমরা কি করব?”

তিনি তাদের বললেন, “কারো কাছ থেকে জোর করে কোন অর্থ নিও না। কারো প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করো না। তোমাদের যা বেতন তাতেই সন্তুষ্ট থেকো।”

15লোকরা মনে মনে আশা করেছিল, “যোহনই হয়তো তাদের সেই প্রত্যাশিত খ্রীষ্ট।”

16তাদের এই রকম চিন্তার জবাবে যোহন বললেন, “আমি তোমাদের জলে বাপ্তাইজ করি, কিন্তু আমার থেকে আরো শক্তিশালী একজন আসছেন, আমি তাঁর জুতোর ফিতে খোলবার যোগ্য নই। তিনিই তোমাদের পবিত্র আত্মায় ও আগুনে বাপ্তাইজ করবেন। 17কুলোর বাতাস দিয়ে খামার পরিষ্কার করার জন্য কুলো তাঁর হাতেই আছে, তা দিয়ে তিনি সব শস্য জড়ো করে তাঁর গোলায় তুলবেন আর অনির্বাণ আগুনে তূষ পুড়িয়ে দেবেন।” 18আরো বিভিন্ন উপদেশের মাধ্যমে লোকদের উৎসাহিত করে যোহন তাদের কাছে সুসমাচার প্রচার করতেন।

যোহনের কর্মের সমাপ্তি

19শাসনকর্তা হেরোদ তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী হেরোদিযাকে বিয়ে করেছিলেন, এরজন্য এবং এছাড়াও তাঁর আরো অনেক অন্যায় কাজের জন্য যোহন হেরোদকে তিরস্কার করলেন। 20তাতে হেরোদ যোহনকে বন্দী করে কারাগারে পাঠালেন আর এইভাবে তিনি তাঁর অন্য সব দুষ্কর্মের সঙ্গে এইটিও যোগ করলেন।

যীশু যোহনের কাছে বাপ্তিস্ম নিলেন

(মথি 3:13-17; মার্ক 1:9-11)

21লোকেরা যখন বাপ্তিস্ম নিচ্ছিল সেই সময় একদিন যীশুও বাপ্তিস্ম নিলেন। বাপ্তিস্মের পর যীশু যখন প্রার্থনা করছিলেন, তখন স্বর্গ খুলে গেল, 22আর স্বর্গ থেকে পবিত্র আত্মা কপোতের মতো তাঁর ওপর নেমে এলেন। তখন স্বর্গ থেকে এই রব শোনা গেল, “তুমি আমার প্রিয় পুত্র, তোমার ওপর আমি খুবই সন্তুষ্ট।”

যোষেফের বংশ পরিচয়

(মথি 1:1-17)

23প্রায় ত্রিশ বছর বয়সে যীশু তাঁর কাজ শুরু করেন। লোকেরা মনে করত তিনি যোষেফেরই ছেলে।

যোষেফ হলেন এলির ছেলে।

24এলি মত্ততের ছেলে।

মত্তত্ লেবির ছেলে।

লেবি মল্কির ছেলে।

মল্কি যান্নায়ের ছেলে।

যান্না যোষেফের ছেলে।

25যোষেফ মত্তথিয়ের ছেলে।

মত্তথিয় আমোসের ছেলে।

আমোস নহূমের ছেলে।

নহূম ইষ্‌লির ছেলে।

ইষ্‌লি নগির ছেলে।

26নগি মাটের ছেলে।

মাট মত্তথিয়ের ছেলে।

মত্তথিয় শিমিয়ির ছেলে।

শিমিয়ি যোষেখের ছেলে।

যোষেখ যূদার ছেলে।

27যূদা য়োহানার ছেলে।

যোহানা রীষার ছেলে।

রীষা সরুব্বাবিলের ছেলে।

সরুব্বাবিল শল্টীয়েলের ছেলে।

শল্টীয়েল নেরির ছেলে।

28নেরি মল্কির ছেলে।

মল্কি অদ্দীর ছেলে।

অদ্দী কোষমের ছেলে।

কোষম ইল‌্মাদমের ছেলে।

ইল‌্মাদম এরের ছেলে।

29এর যিহোশূর ছেলে।

যিহোশূ ইলীয়েষরের ছেলে।

ইলীয়েষর যোরীমের ছেলে।

যোরীম মত্ততের ছেলে।

মত্তত লেবির ছেলে।

30লেবি শিমিয়োনের ছেলে।

শিমিয়োন যূদার ছেলে।

যূদা যোষেফের ছেলে।

যোষেফ যোনমের ছেলে।

যোনম ইলিয়াকীমের ছেলে।

31ইলিয়াকীম মিলেয়ার ছেলে।

মিলেয়া মিন্নার ছেলে।

মিন্না মত্তথের ছেলে।

মত্তথ নাথনের ছেলে।

নাথন দায়ূদের ছেলে।

32দায়ূদ যিশয়ের ছেলে।

যিশয় ওবেদের ছেলে।

ওবেদ বোয়সের ছেলে।

বোয়স সলমোনের ছেলে।

সলমোন নহশোনের ছেলে।

33নহশোন অম্মীনাদবের ছেলে।

অম্মীনাদব অদমানের ছেলে।

অদমান অর্ণির ছেলে।

অর্ণি হিষ্রোণের ছেলে।

হিষ্রোণ পেরসের ছেলে।

পেরস যিহূদার ছেলে।

34যিহূদা যাকোবের ছেলে।

যাকোব ইস‌্হাকের ছেলে।

ইস‌্হাক অব্রাহামের ছেলে।

অব্রাহাম তেরূহের ছেলে।

তেরূহ নাহোরের ছেলে।

35নাহোর সরূগের ছেলে।

সরূগ রিয়ুর ছেলে।

রিয়ু পেলগের ছেলে।

পেলগ এবরের ছেলে।

এবর শেলহের ছেলে।

36শেলহ কৈননের ছেলে।

কৈনন অর্ফক্ষদের ছেলে।

অর্ফক্ষদ শেমের ছেলে।

শেম নোহের ছেলে।

নোহ লেমকের ছেলে।

37লেমক মথূশেলহের ছেলে।

মথূশেলহ হনোকের ছেলে।

হনোক যেরদের ছেলে।

যেরদ মহললেলের ছেলে।

মহললেল কৈননের ছেলে।

38কৈনন ইনোশের ছেলে।

ইনোশ শেথের ছেলে।

শেথ আদমের ছেলে।

আদম ঈশ্বরের ছেলে।

4

যীশু দিয়াবল দ্বারা পরীক্ষিত হন

(মথি 4:1-11; মার্ক 1:12-13)

1এরপর যীশু পবিত্র আত্মায় পূর্ণ হয়ে যর্দন নদী থেকে ফিরে এলেন: আর আত্মার পরিচালনায় প্রান্তরের মধ্যে গেলেন। 2সেখানে চল্লিশ দিন ধরে দিয়াবল তাঁকে প্রলোভনে ফেলতে চাইল। সেই সময় তিনি কিছুই খাদ্য গ্রহণ করেন নি। ঐ সময় পার হয়ে গেলে যীশুর খিদে পেল।

3তখন দিয়াবল তাঁকে বলল, “তুমি যদি ঈশ্বরের পুত্র হও, তবে এই পাথরটিকে রুটি হয়ে যেতে বল।”

4এর উত্তরে যীশু তাকে বললেন, “শাস্ত্রে লেখা আছে:

‘মানুষ কেবল রুটিতেই বাঁচে না।’”+ 4:4 উদ্ধৃতি দ্বিতীয় বিবরণ 8:3.

5এরপর দিয়াবল তাঁকে একটা উঁচু জায়গায় নিয়ে গেল আর মুহূর্তের মধ্যে জগতের সমস্ত রাজ্য দেখাল। 6দিয়াবল যীশুকে বলল, “এইসব রাজ্যের পরাক্রম ও মহিমা আমি তোমায় দেব, কারণ এই সমস্তই আমাকে দেওয়া হয়েছে, আর আমি যাকে চাই তাকেই এসব দিতে পারি। 7এখন তুমি যদি আমার উপাসনা কর তবে এসবই তোমার হবে।”

8এর উত্তরে যীশু তাকে বললেন, “শাস্ত্রে লেখা আছে:

‘তুমি কেবল তোমার প্রভু ঈশ্বরকেই উপাসনা করবে,

কেবল তাঁরই সেবা করবে!’”+ 4:8 উদ্ধৃতি দ্বিতীয় বিবরণ 6:13.

9এরপর দিয়াবল তাঁকে জেরুশালেমে নিয়ে গিয়ে মন্দিরের চূড়ার ওপরে দাঁড় করিয়ে বলল, “তুমি যদি ঈশ্বরের পুত্র হও, তবে এখান থেকে লাফ দিয়ে নীচে পড়। 10কারণ শাস্ত্রে লেখা আছে:

‘ঈশ্বর তাঁর স্বর্গদূতদের তোমার বিষয়ে আদেশ দেবেন

যেন তারা তোমাকে রক্ষা করে।’+ 4:10 উদ্ধৃতি গীতসংহিতা 91:11.

11আরো লেখা আছে:

‘তারা তোমাকে তাদের হাতে করে তুলে ধরবে

যেন তোমার পায়ে পাথরের আঘাত না লাগে।’”+ 4:11 উদ্ধৃতি গীতসংহিতা 91:12.

12এর উত্তরে যীশু তাকে বললেন, “শাস্ত্রে একথাও বলা হয়েছে: ‘তুমি তোমার প্রভু ঈশ্বরের পরীক্ষা করো না।’”+ 4:12 উদ্ধৃতি দ্বি. বি. 6:16.

13এইভাবে দিয়াবল তাঁকে সমস্ত রকমের প্রলোভনে ফেলার চেষ্টা করে, আরো ভাল সুযোগের অপেক্ষায় যীশুকে ছেড়ে চলে গেল।

যীশু লোকজনকে শিক্ষা দিলেন

(মথি 4:12-17; মার্ক 1:14-15)

14যীশু পবিত্র আত্মার পরিচালনায় গালীলে ফিরে গেলে ঐ সংবাদ সেই অঞ্চলের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। 15তিনি তাদের সমাজ-গৃহে শিক্ষা দিতে লাগলেন, আর সবাই তাঁর প্রশংসা করতে লাগল।

যীশু তাঁর নিজের নগরে গেলেন

(মথি 13:53-58; মার্ক 6:1-6)

16এরপর যীশু নাসরতে গেলেন, এখানেই তিনি প্রতিপালিত হয়েছিলেন। তাঁর রীতি অনুসারে বিশ্রামবারে তিনি সমাজ-গৃহে+ 4:16 সমাজ-গৃহ এই স্থানে ইহুদীরা প্রার্থনা, শাস্ত্র পাঠ ও সাধারণ সভার জন্য জড়ো হোত। গিয়ে সেখানে শাস্ত্র পাঠ করার জন্য উঠে দাঁড়ালেন।

17তাঁর হাতে ভাববাদী যিশাইয়র লেখা পুস্তকটি দেওয়া হল। তিনি পুস্তকটি খুলে সেই অংশটি পেলেন, যেখানে লেখা আছে:

18“প্রভুর আত্মা আমার ওপর আছেন

কারণ দীন দরিদ্রের কাছে সুসমাচার প্রচারের জন্য তিনিই আমায় নিযুক্ত করেছেন।

তিনি আমাকে বন্দীদের কাছে স্বাধীনতার কথা

ও অন্ধদের কাছে দৃষ্টি ফিরে পাবার কথা ঘোষণা করতে পাঠিয়েছেন;

আর নির্যাতিতদের মুক্ত করতে বলেছেন।

19এছাড়া প্রভুর অনুগ্রহ দানের বৎসরের কথা ঘোষণা করতেও পাঠিয়েছেন।”+ 4:19 উদ্ধৃতি যিশাইয় 61:1-2.

20এরপর তিনি পুস্তকটি গুটিয়ে সেখানকার সহায়কদের হাতে দিয়ে বসলেন। সে সময় যারা সমাজ-গৃহে ছিল, তাদের সকলের দৃষ্টি তাঁর ওপর গিয়ে পড়ল। 21তখন তিনি তাদের বললেন, “শাস্ত্রের এই কথা যা তোমরা শুনলে তা আজ পূর্ণ হল।”

22সকলেই তাঁর খুব প্রশংসা করল, তাঁর মুখে অপূর্ব সব কথা শুনে তারা আশ্চর্য হয়ে গেল। তারা বলল, “এ কি যোষেফের ছেলে নয়?”

23তখন তিনি তাদের বললেন, “তোমরা নিশ্চয়ই আমার বিষয়ে প্রচলিত প্রবাদটি বলবে, ‘চিকিৎসক, আগে নিজেকে সুস্থ কর। কফরনাহূমে যে সমস্ত কাজ করেছ বলে আমরা শুনেছি সে সব এখন এখানে নিজের গ্রামেও কর দেখি!’” 24তারপর যীশু বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, কোন ভাববাদী তাঁর নিজের গ্রামে গ্রাহ্য হন না।

25 “সত্যি বলতে কি এলিয়র সময়ে যখন সাড়ে তিন বছর ধরে আকাশ রুদ্ধ ছিল এবং সারা দেশে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ চলছিল, সেই সময ইস্রায়েল দেশে অনেক বিধবা ছিল। কিন্তু তাদের কারো কাছে এলিয়কে পাঠানো হয় নি, কেবল সীদোন প্রদেশে সারিফতে সেই বিধবার কাছেই তাঁকে পাঠানো হয়েছিল।

27“আবার ভাববাদী ইলীশায়ের সময়ে ইস্রায়েল দেশে অনেক কুষ্ঠরোগী ছিল, কিন্তু তাদের কেউ সুস্থ হয় নি, কেবল সুরীয় নামান সুস্থ হয়েছিল।”

28এই কথা শুনে সমাজ-গৃহের সমস্ত লোক রেগে আগুন হয়ে গেল। 29তারা উঠে যীশুকে নগরের বাইরে বার করে দিল আর নগরটি যে পাহাড়ের ওপর ছিল তার শেষ প্রান্তে তাঁকে ঠেলে নিয়ে গেল, যেন পাহাড়ের চূড়া থেকে তাঁকে নীচে ফেলে দিতে পারে। 30কিন্তু তিনি তাদের মাঝখান দিয়ে চলে গেলেন।

অশুচি আত্মায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে যীশু সুস্থ করলেন

(মার্ক 1:21-28)

31এরপর যীশু গালীলের কফরনাহূম শহরে গেলেন। সেখানে তিনি বিশ্রামবারে তাদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন। 32তাঁর দেওয়া শিক্ষায় তারা আশ্চর্য হয়ে গেল, কারণ তাঁর শিক্ষা ছিল ক্ষমতাযুক্ত।

33সেই সমাজগৃহে অশুচি আত্মায় পাওয়া একজন লোক ছিল, সে চিৎকার করে বলে উঠল, 34“ওহে নাসরতীয় যীশু! আমাদের কাছে আপনার কি দরকার? আপনি কি আমাদের ধ্বংস করতে এসেছেন? আমি জানি আপনি কে, আপনি ঈশ্বরের পবিত্র ব্যক্তি!” 35যীশু তাকে ধমক দিয়ে বললেন, “চুপ করো! আর ওর মধ্য থেকে বার হয়ে যাও!” তখন সেই অশুচি আত্মা লোকটিকে সকলের মাঝখানে আছড়ে ফেলে দিয়ে তার কোন ক্ষতি না করে তার মধ্যে থেকে বার হয়ে গেল।

36এই দেখে লোকেরা অবাক হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, “এর মানে কি? সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও কর্ত্তৃত্বের সঙ্গে তিনি অশুচি আত্মাদের হুকুম করেন আর তারা বার হয়ে যায়।” 37তাঁর বিষয়ে এই কথা সেই অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল।

যীশু এক স্ত্রীলোককে আরোগ্যদান করলেন

(মথি 8:14-17; মার্ক 1:29-34)

38যীশু সমাজ-গৃহ থেকে বেরিয়ে শিমোনের বাড়িতে গেলেন। সেখানে শিমোনের শাশুড়ী খুব জ্বরে ভুগছিলেন, তাই তারা এসে তাঁকে অনুরোধ করল যেন তিনি তাঁকে সুস্থ করেন। 39তখন যীশু তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে জ্বরকে ধমক দিলেন, এর ফলে জ্বর ছেড়ে গেল, আর তিনি তখনই উঠে তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে লাগলেন।

আরো বহু লোককে যীশু সুস্থ করলেন

40সূর্য অস্ত যাবার সময় লোকরা তাদের বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের লোকজন, যারা নানা রোগে অসুস্থ ছিল তাদের যীশুর কাছে নিয়ে এল। যীশু তাদের প্রত্যেকের ওপরে হাত রেখে তাদের সুস্থ করলেন। 41তাদের অনেকের মধ্যে থেকে ভূত বার হয়ে এল। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, “আপনি ঈশ্বরের পুত্র।” কিন্তু তিনি তাদের ধমক দিলেন, তাদের কথা বলতে দিলেন না, কারণ তারা জানত যে তিনিই সেই খ্রীষ্ট।

যীশু অন্যান্য শহরে গেলেন

(মার্ক 1:35-39)

42ভোর হলে যীশু সেই জায়গা ছেড়ে এক নির্জন জায়গায় চলে গেলেন। কিন্তু বিরাট জনতা তাঁর খোঁজ করতে লাগল; আর তিনি যেখানে ছিলেন সেখানে এসে হাজির হল এবং তিনি যেন তাদের কাছ থেকে চলে না যান সেজন্য তাঁকে আটকাতে চেষ্টা করল। 43কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “ঈশ্বরের রাজ্যের এই সুসমাচার আমাকে অন্যান্য শহরেও বলতে হবে, কারণ এরই জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে।”

44এরপর তিনি যিহূদিযার বিভিন্ন সমাজ-গৃহে প্রচার করতে লাগলেন।

5

পিতর, যাকোব এবং যোহন যীশুকে অনুসরণ করলেন

(মথি 4:18-22; মার্ক 1:16-20)

1একদিন যীশু গিনেষরত হ্রদের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন। বহুলোক তাঁর চারপাশে ভীড় করে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের শিক্ষা শুনছিল। 2তিনি দেখলেন, হ্রদের ধারে দুটি নৌকা দাঁড়িয়ে আছে আর জেলেরা নৌকা থেকে নেমে জাল ধুচ্ছে। 3তিনি একটি নৌকায় উঠলেন, সেই নৌকাটি ছিল শিমোনের। যীশু তাঁকে তীর থেকে নৌকাটিকে একটু দূরে নিয়ে যেতে বললেন। তারপর তিনি নৌকায় বসে সেখান থেকে লোকদের শিক্ষা দিতে লাগলেন।

4তাঁর কথা শেষ হলে তিনি শিমোনকে বললেন, “এখন গভীর জলে নৌকা নিয়ে চল, আর সেখানে মাছ ধরার জন্য তোমাদের জাল ফেল।”

5শিমোন উত্তর দিলেন, “প্রভু, আমরা সারা রাত ধরে কঠোর পরিশ্রম করে কিছুই ধরতে পারি নি; কিন্তু আপনি যখন বলছেন তখন আমি জাল ফেলব।” 6তাঁরা জাল ফেললে প্রচুর মাছ জালে ধরা পড়ল। মাছের ভারে তাদের জাল ছিঁড়ে যাবার উপক্রম হল। 7তখন তাঁরা সাহায্যের জন্য ইশারা করে অন্য নৌকার সঙ্গীদের ডাকলেন। সঙ্গীরা এসে দুটো নৌকায় এত মাছ বোঝাই করলেন যে সেগুলো ডুবে যাবার উপক্রম হল।

8 এই দেখে পিতর যীশুর পায়ে পড়ে বললেন, “প্রভু আমি একজন পাপী। আপনি আমার কাছ থেকে চলে যান।” কারণ জালে এত মাছ ধরা পড়েছে দেখে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা সকলে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। 10সিবদিয়ের ছেলে যাকোব ও যোহন যাঁরা তাঁর ভাগীদার ছিলেন তাঁরাও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

তখন যীশু শিমোনকে বললেন, “ভয় পেও না, এখন থেকে তুমি মাছ নয় বরং মানুষ ধরবে।”

11এরপর তাঁরা নৌকাগুলো তীরে এনে সব কিছু ফেলে রেখে যীশুর সঙ্গে চললেন।

একজন কুষ্ঠ রোগীকে যীশু আরোগ্যদান করলেন

(মথি 8:1-4; মার্ক 1:40-45)

12একবার যীশু কোন এক নগরে ছিলেন, সেখানে একজন লোক যার সর্বাঙ্গ কুষ্ঠরোগে ভরে গিয়েছিল, সে যীশুকে দেখে তাঁর সামনে উপুড় হয়ে পড়ে মিনতি করে বলল, “প্রভু, আপনি যদি ইচ্ছা করেন তাহলেই আমাকে ভালো করতে পারেন।”

13তখন যীশু হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে বললেন, “আমি তা-ই চাই। তুমি আরোগ্য লাভ কর!” আর সঙ্গে সঙ্গে তার কুষ্ঠ ভালো হয়ে গেল। 14তখন যীশু তাকে আদেশ করলেন, “দেখ, একথা কাউকে বোলো না; কিন্তু যাও, যাজকদের কাছে গিয়ে নিজেকে দেখাও, আর শুচি হবার জন্য মোশির নির্দেশ মতো বলি উৎসর্গ কর। তুমি যে আরোগ্য লাভ করেছ, সবার সামনে এইভাবে তা প্রকাশ কর।”

15যীশুর বিষয়ে নানা খবর চতুর্দিকে আরো ছড়িয়ে পড়তে লাগল, আর বহুলোক ভীড় করে তাঁর কথা শুনতে ও রোগ থেকে সুস্থ হবার জন্য তাঁর কাছে আসতে লাগল। 16কিন্তু যীশু প্রায়ই নির্জন জায়গায় প্রান্তরের মধ্যে গিয়ে প্রার্থনা করতেন।

যীশু একজন পঙ্গুকে সুস্থ করেন

(মথি 9:1-8; মার্ক 2:1-12)

17একদিন তিনি যখন শিক্ষা দিচ্ছেন তখন সেখানে কয়েকজন ফরীশী ও ব্যবস্থার শিক্ষক বসেছিল। এরা গালীল ও যিহূদিয়ার প্রতিটি নগর ও জেরুশালেম থেকে এসেছিল। রোগীদের সুস্থ করার জন্য প্রভুর শক্তি যীশুর মধ্যে ছিল। 18সেই সময় কয়েকজন লোক খাটে করে একজন পঙ্গুকে বয়ে নিয়ে এল। তারা তাকে ভেতরে যীশুর কাছে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল; 19কিন্তু ভীড়ের জন্য ভেতরে যাবার পথ পেল না। তখন তারা ছাদে উঠে ছাদের টালি সরিয়ে তাকে তার খাটিযা সমেত লোকদের মাঝে যেখানে যীশু ছিলেন সেখানে নামিয়ে দিল। 20তাদের এই বিশ্বাস দেখে যীশু বললেন, “তোমার পাপ ক্ষমা করা হল।”

21এই শুনে ইহুদী ব্যবস্থার শিক্ষকরা ও ফরীশীরা নিজেদের মধ্যে মনে মনে ভাবতে লাগল, “এই লোকটা কে যে ঈশ্বর নিন্দা করছে! একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করতে পারে?”

22কিন্তু যীশু তাদের মনের চিন্তা বুঝতে পেরে বললেন, “তোমরা মনে মনে কেন ঐ কথা ভাবছ? 23কোনটা বলা সহজ, ‘তোমার পাপ ক্ষমা করা হল,’ না ‘তুমি উঠে হেঁটে বেড়াও?’ 24কিন্তু তোমরা যেন জানতে পারো যে পৃথিবীতে পাপ ক্ষমা করার ক্ষমতা মানবপুত্রের+ 5:24 মানবপুত্র যীশু, দানি. 7:13-14 খ্রীষ্টের জন্য এই নাম ব্যবহার করা হয়েছে, ইনি সেই ব্যক্তি যাকে ঈশ্বর জগতের মানুষের পরিত্রাতা হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। আছে।” তাই তিনি পঙ্গু লোকটিকে বললেন, “আমি তোমায় বলছি, ওঠো! তোমার খাটিয়া তুলে নিয়ে বাড়ি যাও।”

25আর লোকটি সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামনে উঠে দাঁড়াল আর যে খাটিয়ার ওপর সে শুয়েছিল তা তুলে নিয়ে ঈশ্বরের প্রশংসা করতে করতে বাড়ি চলে গেল। 26এই দেখে সবাই খুব আশ্চর্য হয়ে গেল, আর ঈশ্বরের প্রশংসা করতে লাগল। তারা ভয় ও ভক্তিতে পূর্ণ হয়ে বলতে লাগল, “আজ আমরা এক বিস্ময়কর ঘটনা দেখলাম।”

লেবির যীশুকে অনুসরণ

(মথি 9:9-13; মার্ক 2:13-17)

27এই ঘটনার পর যীশু সেখান থেকে বাইরে গেলে কর আদায় করার জায়গায় লেবি নামে একজন কর আদায়কারীকে বসে থাকতে দেখলেন। যীশু তাকে বললেন, “আমার সঙ্গে এস!” 28আর লেবি সব কিছু ফেলে রেখে উঠে পড়লেন ও যীশুর সঙ্গে চললেন।

29যীশুর জন্য লেবি তাঁর বাড়িতে একটা বড় ভোজের আয়োজন করলেন। তাদের সঙ্গে অনেক কর আদায়কারী ও অন্যান্য আরো অনেকে খেতে বসল। 30তখন ফরীশী ও তাদের ব্যবস্থার শিক্ষকরা যীশুর অনুগামীদের কাছে অভিযোগ করে বলল, “তোমরা কেন কর আদায়কারী ও মন্দ লোকদের সঙ্গে ভোজন পান কর?”

31এর জবাবে যীশু তাদের বললেন, “সুস্থ লোকেদের জন্য চিকিৎসকের প্রয়োজন নেই; কিন্তু যারা অসুস্থ তাদের জন্য চিকিৎসকের দরকার আছে। 32আমি ধার্মিকদের নয় কিন্তু মন্দ লোকদের ডাকতে এসেছি; যেন তারা পাপের পথ থেকে ফেরে।”

যীশু উপবাস সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিলেন

(মথি 9:14-17; মার্ক 2:18-22)

33তারা যীশুকে বলল, “যোহনের অনুগামীরা প্রায়ই প্রার্থনা ও উপবাস করে, ফরীশীদের অনুগামীরাও তা করে; কিন্তু আপনার অনুগামীরা তো সব সময়ই ভোজন পান করছে।”

34যীশু তাদের বললেন, “বর সঙ্গে থাকতে কি তোমরা বর যাত্রীদের উপোস করে থাকতে বলতে পার? 35কিন্তু এমন সময় আসছে যখন বরকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে আর সেই সময় তারা উপোস করবে।”

36তিনি তাদের কাছে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বললেন, “নতুন জামা থেকে একটি টুকরো ছিঁড়ে নিয়ে কেউ কি পুরানো জামায় তালি দেয়? যদি কেউ তা করে তবে সে তার নতুন জামাটি ছিঁড়ল, আবার সেই ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো পুরানোর সঙ্গে মানাবে না। 37পুরানো চামড়ার থলিতে কেউ টাটকা দ্রাক্ষারস রাখে না, রাখলে টাটকা দ্রাক্ষারস চামড়ার থলিটি ফাটিয়ে দেবে তাতে রস ও পড়ে যাবে আর থলি ও নষ্ট হবে। 38টাটকা দ্রাক্ষারস নতুন চামড়ার থলিতে রাখাই উচিত; 39আর পুরানো দ্রাক্ষারস পান করার পর কেউ টাটকা দ্রাক্ষারস পান করতে চায় না, কারণ সে বলে ‘পুরাতনটাই ভাল।’”

6

যীশুই বিশ্রামবারের প্রভু

(মথি 12:1-8; মার্ক 2:23-28)

1কোন এক বিশ্রামবারে যীশু একটি শস্য ক্ষেতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর শিষ্যরা শীষ ছিঁড়ে হাতে মেড়ে মেড়ে খাচ্ছিলেন। 2এই দেখে কয়েকজন ফরীশী বলল, “যে কাজ করা বিশ্রামবারে বিধি-সম্মত নয় তা তোমরা করছ কেন?”

3এর উত্তরে যীশু তাদের বললেন, “দায়ূদ ও তাঁর সঙ্গীদের যখন খিদে পেয়েছিল তখন তাঁরা কি করেছিলেন তা কি তোমরা পড় নি? 4তিনি তো ঈশ্বরের গৃহে ঢুকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত রুটি নিয়ে খেয়েছিলেন, আর তাঁর সঙ্গীদের তা দিয়েছিলেন, যা যাজক ছাড়া অন্য কারো খাওয়া বিধি-সম্মত ছিল না।” 5যীশু তাদের আরও বললেন, “মানবপুত্রই বিশ্রামবারের প্রভু।”

বিশ্রামবারে যীশু এক ব্যক্তিকে সুস্থ করলেন

(মথি 12:9-14; মার্ক 3:1-6)

6আর এক বিশ্রামবারে তিনি সমাজ-গৃহে গিয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন। সেখানে একজন লোক ছিল যার ডান হাতটি শুকিয়ে গিয়েছিল। 7তিনি তাকে বিশ্রামবারে সুস্থ করেন কি না দেখার জন্য ব্যবস্থার শিক্ষকরা ও ফরীশীরা তাঁর ওপর নজর রাখছিল, যেন তারা যীশুর বিরুদ্ধে দোষ দেবার কোন সূত্র খুঁজে পায়। 8যীশু তাদের মনের চিন্তা জানতেন, তাই যে লোকটির হাত শুকিয়ে গিয়েছিল তাকে বললেন, “তুমি সকলের সামনে উঠে দাঁড়াও!” তখন সেই লোকটি সকলের সামনে উঠে দাঁড়াল। 9যীশু তাদের বললেন, “আমি তোমাদের একটা প্রশ্ন করি, বিশ্রামবারে কি করা বিধিসম্মত, ভাল করা না ক্ষতি করা? কাউকে প্রাণে বাঁচানো না ধ্বংস করা?”

10চারপাশে তাদের সকলের দিকে তাকিয়ে তিনি লোকটিকে বললেন, “তোমার হাতখানা বাড়াও।” সে তাই করলে তার হাত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গেল। 11কিন্তু ফরীশী ও ব্যবস্থার শিক্ষকরা রাগে জ্বলতে লাগল। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল, “যীশুর প্রতি কি করা হবে?”

যীশু বারোজন প্রেরিতকে মনোনীত করলেন

(মথি 10:1-4; মার্ক 3:13-19)

12যীশু সেই সময় একবার প্রার্থনা করার জন্য একটি পর্বতে গেলেন। সারা রাত ধরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় কাটালেন। 13সকাল হলে তিনি তাঁর অনুগামীদেব নিজের কাছে ডাকলেন ও তাঁদের মধ্য থেকে বারোজনকে মনোনীত করে তাঁদের “প্রেরিত” পদে নিয়োগ করলেন। তাঁরা হলেন,

14শিমোন যার নাম রাখলেন তিনি পিতর

আর তার ভাই আন্দ্রিয়,

যাকোব

ও যোহন

আর ফিলিপ

ও বর্থলময়,

15মথি,

থোমা,

আলফেয়ের ছেলে যাকোব,

শিমোন যে ছিল দেশ ভক্ত দলের লোক।

16যাকোবের ছেলে যিহূদা

আর যিহূদা ঈষ্করিয়োতীয়, যে পরে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছিল।

যীশু শিক্ষা দিলেন ও আরোগ্যদান করলেন

(মথি 4:23-25; 5:1-12)

17যীশু তাঁর প্রেরিতদের+ 6:17 প্রেরিত প্রেরিত তাদেরই বলা হত, যাদের যীশু তাঁর কাজের জন্য বিশেষ সহায়ক হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে পর্বত থেকে নেমে একটা সমতল জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন। সেখানে তাঁর আরো অনুগামী এসে জড়ো হয়েছিল। সমস্ত যিহূদা জেরুশালেম এবং সোর সীদোনের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে বিস্তর লোক তাঁর কাছে এসে জড় হল। 18তাঁরা তার কথা শুনতে ও তাদের রোগ-ব্যাধি থেকে সুস্থ হতে তাঁর কাছে এসেছিল। যাঁরা মন্দ আত্মার প্রকোপে কষ্ট পাচ্ছিল তারাও সুস্থ হল। 19সকলেই তাঁকে স্পর্শ করার চেষ্টা করতে লাগল, কারণ তাঁর মধ্য থেকে শক্তি বার হয়ে তাদের আরোগ্য দান করছিল।

20যীশু তাঁর অনুগামীদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,

“দরিদ্ররা তোমরা ধন্য,

কারণ ঈশ্বরের রাজ্য তোমাদেরই।

21তোমরা এখন যারা ক্ষুধিত, তারা ধন্য

কারণ তোমরা পরিতৃপ্ত হবে।

তোমরা এখন যারা চোখের জল ফেলছ, তারা ধন্য,

কারণ তোমরা আনন্দ করবে।

22“ধন্য তোমরা যখন মানবপুত্রের লোক বলে অন্যরা তোমাদের ঘৃণা করে, সমাজচ্যুত করে, অপমান করে, তোমাদের নাম মুখে আনতে চায় না এবং তোমাদের কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। 23সেই দিন তোমরা আনন্দ করবে, আনন্দে নৃত্য করবে কারণ দেখ স্বর্গে তোমাদের জন্য পুরস্কার সঞ্চিত আছে। ওদের পূর্বপুরুষরা ভাববাদীদের সঙ্গে এই রকমই ব্যবহার করেছে।

24“কিন্তু ধনী ব্যক্তিরা, ধিক্ তোমাদের,

কারণ তোমরা তো এখনই সুখ পাচ্ছ।

25তোমরা যারা আজ পরিতৃপ্ত, ধিক্ তোমাদের,

কারণ তোমরা ক্ষুধার্ত হবে।

তোমরা যারা আজ হাসছ, ধিক্ তোমাদের,

কারণ তোমরা কাঁদবে, শোক করবে।

26“ধিক্ তোমাদের যখন সব লোক তোমাদের প্রশংসা করে, কারণ এইসব লোকদের পূর্বপুরুষরা ভণ্ড ভাববাদীদেরও প্রশংসা করত।

শত্রুদের ভালবাসো

(মথি 5:38-48; 7:12)

27“তোমরা যারা শুনছ, আমি কিন্তু তোমাদের বলছি, তোমরা তোমাদের শত্রুদের ভালবেসো। যারা তোমাদের ঘৃণা করে, তাদের মঙ্গল করো। 28যারা তোমাদের অভিশাপ দেয়, তাদের আশীর্বাদ করো। যারা তোমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, তাদের জন্য প্রার্থনা করো। 29কেউ যদি তোমার একগালে চড় মারে, তার কাছে অপর গালটি বাড়িয়ে দাও। কেউ যদি তোমার চাদর কেড়ে নেয়, তাকে তোমার জামাটিও নিতে দাও। 30তোমার কাছে যে চায় তাকে দাও। আর তোমার কোন জিনিস যদি কেউ নেয়, তবে তা ফেরত চেও না। 31অন্যের কাছ থেকে তুমি যেমন ব্যবহার পেতে চাও, তাদের সঙ্গেও তুমি তেমনি ব্যবহার করো।

32“যারা তোমাদের ভালবাসে, তোমরা যদি কেবল তাদেরই ভালবাস, তবে তাতে প্রশংসার কি আছে? কারণ পাপীরাও তো একই রকম করে। 33যারা তোমাদের উপকার করে, তোমরা যদি কেবল তাদেরই উপকার কর, তাতে প্রশংসার কি আছে? পাপীরাও তো তাই করে। 34যারা ধার শোধ করতে পারে এমন লোকদেরই যদি কেবল তোমরা ধার দাও, তবে তাতে প্রশংসার কি আছে? এমন কি পাপীরাও তা ফিরে পাবার আশায় তাদের মতো পাপীদের ধার দেয়।

35“কিন্তু তোমরা তোমাদের শত্রুদের ভালবেসো, তাদের মঙ্গল করো, আর কিছুই ফিরে পাবার আশা না রেখে ধার দিও। তাহলে তোমাদের মহাপুরস্কার লাভ হবে, আর তোমরা হবে পরমেশ্বরের সন্তান, কারণ তিনি অকৃতজ্ঞ ও দুষ্টদের প্রতিও দয়া করেন। 36তোমাদের পিতা যেমন দয়ালু তোমরাও তেমন দয়ালু হও।

নিজেদের দিকে তাকাও

(মথি 7:1-5)

37“অপরের বিচার করো না, তাহলে তোমাদেরও বিচারের সম্মুখীন হতে হবে না। অপরের দোষ ধরো না, তাহলে তোমাদেরও দোষ ধরা হবে না। অন্যকে ক্ষমা করো, তাহলে তোমাদেরও ক্ষমা করা হবে। 38দান কর, প্রতিদান তুমিও পাবে। তারা তোমাদের অনেক বেশী করে, চেপে চেপে, ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে উপচে দেবে। কারণ অন্যদের জন্য যে মাপে মেপে দিচ্ছ, সেই মাপেই তোমাদের মেপে দেওয়া হবে।”

39যীশু তাদের কাছে আর একটি দৃষ্টান্ত দিলেন, “একজন অন্ধ কি অন্য একজন অন্ধকে পথ দেখাতে পারে? তাহলে কি তারা উভয়েই গর্তে পড়বে না? 40কোন ছাত্র তার শিক্ষকের উর্দ্ধে নয়; কিন্তু শিক্ষা সম্পূর্ণ হলে প্রত্যেক ছাত্র তার শিক্ষকের মতো হতে পারে।

41“তোমার ভাইয়ের চোখে যে কুটো আছে তুমি সেটা দেখছ, কিন্তু তোমার নিজের চোখে যে তক্তা আছে সেটা দেখছ না, কেন? 42তোমার নিজের চোখে যে তক্তা আছে তা যখন লক্ষ্য করছ না, তখন কেমন করে তোমার ভাইকে বলতে পার, ‘ভাই তোমার চোখে যে কুটোটা আছে, এস তা বার করে দিই।’ কেন তুমি একথা বল? ভণ্ড! প্রথমে তোমার নিজের চোখ থেকে তক্তা বার করে ফেল, আর তবেই তোমার ভাইয়ের চোখে যে কুটো আছে, তা বার করার জন্য স্পষ্ট করে দেখতে পাবে।

দু’প্রকার ফল

(মথি 7:17-20; 12:34-35)

43“এমন কোন ভাল গাছ নেই যাতে খারাপ ফল ধরে, আবার এমন কোন খারাপ গাছ নেই যাতে ভাল ফল ধরে। 44প্রত্যেক গাছকে তার ফল দিয়েই চেনা যায়। লোকে কাঁটা-ঝোপ থেকে ডুমুর ফল তোলে না, বা বুনো ঝোপ থেকে দ্রাক্ষা সংগ্রহ করে না। 45সৎ‌ লোকের অন্তরের ভাল ভাণ্ডার থেকে ভাল জিনিসই বার হয়। আর দুষ্ট লোকের মন্দ অন্তর থেকে মন্দ বিষয়ই বার হয়। মানুষের অন্তরে যা থাকে তার মুখ সে কথাই বলে।

দু’প্রকার লোক

(মথি 7:24-27)

46“তোমরা কেন আমাকে ‘প্রভু, প্রভু’ বলে ডাক, অথচ আমি যা বলি তা কর না? 47যে কেউ আমার কাছে আসে ও আমার কথা শুনে সেসব পালন করে, সে কার মতো? 48সে এমন একজন লোকের মতো, যে বাড়ি তৈরী করতে গভীর ভাবে খুঁড়ে পাথরের ওপর ভিত গাঁথল। তাই যখন বন্যা এল, তখন নদীর জলের ঢেউ এসে সেই বাড়িটিতে আঘাত করল, কিন্তু তা নড়াতে পারল না, কারণ তার ভিত ছিল মজবুত।

49“যে আমার কথা শোনে অথচ সেই মতো কাজ না করে, সে এমন একজন লোকের মতো, যে মাটির উপর ভিত ছাড়াই বাড়ি তৈরী করেছিল। পরে নদীর স্রোত এসে তাতে আঘাত করলে তখনই বাড়িটা ভেঙে পড়ল এবং একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল।”

7

একজন দাসকে যীশু সুস্থ করলেন

(মথি 8:5-13; যোহন 4:43-54)

1যীশু লোকদের যা বলতে চেয়েছিলেন তা বলা শেষ করে কফরনাহূম শহরে গেলেন। 2সেখানে একজন রোমীয় শতপতির এক ক্রীতদাস গুরুতর অসুখে মরনাপন্ন হয়েছিল। এই ক্রীতদাসটি শতপতির অতি প্রিয় ছিল। 3শতপতি যখন যীশুর কথা শুনতে পেলেন তখন ইহুদীদের কয়েকজন নেতাকে দিয়ে যীশুর কাছে বলে পাঠালেন, যেন যীশু এসে তাঁর দাসের জীবন রক্ষা করেন। 4তাঁরা যীশুর কাছে এসে তাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে বললেন, “যাঁর জন্য আপনাকে এই কাজ করতে বলছি, তিনি একজন যোগ্য লোক। 5কারণ তিনি আমাদের লোকদের ভালবাসেন, আর তিনি আমাদের জন্য একটা সমাজ-গৃহ নির্মাণ করে দিয়েছেন।”

6তখন যীশু তাদের সঙ্গে গেলেন। তিনি যখন সেই বাড়ির কাছাকাছি এসেছেন তখন সেই শতপতি তাঁর বন্ধুদের দিয়ে বলে পাঠালেন, “প্রভু আপনি আর কষ্ট করবেন না, কারণ আপনি যে আমার বাড়িতে আসেন তার যোগ্য আমি নই। 7এই কারণেই আমি নিজেকে আপনার কাছে যাবার উপযুক্ত মনে করি না। আপনি কেবল মুখে বলুন তাতেই আমার ঐ দাস ভাল হয়ে যাবে। 8কারণ আমিও একজনের অধীনে কাজ করি, আর আমার অধীনেও সৈনিকরা কাজ করে। আমি যদি কাউকে বলি ‘যাও’ তখন সে যায়, আবার কাউকে যদি বলি ‘এস’ তবে সে আসে। আর আমি যখন একজনকে বলি, ‘এটা কর,’ তখন সে তা করে।”

9এই কথা শুনে যীশু আশ্চর্য হলেন। যে সব লোক ভীড় করে তাঁর পিছনে পিছনে আসছিল, তাদের দিকে ফিরে তিনি বললেন, “আমি তোমাদের বলছি, এমন কি ইস্রায়েলীয়দের মধ্যেও এত বড় বিশ্বাস আমি কখনও দেখিনি।”

10সেনাপতি যাদের পাঠিয়েছিলেন, তারা বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখল যে সেই চাকর ভাল হয়ে গেছে।

যীশু একজনের জীবন দান করলেন

11এর অল্প দিন পরেই যীশু নায়িন্ নামে একটি নগরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁর শিষ্যরা এবং আরও অনেক লোক তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছিল। 12তিনি যখন সেই নগরের ফটকের কাছাকাছি এসেছেন, তখন একজন মৃত লোককে বয়ে নিয়ে যাওযা হচ্ছিল। সেই মৃত লোকটি ছিল তার বিধবা মায়ের একমাত্র পুত্র। সেই নগরের অনেক লোক সেই বিধবার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছিল। 13সেই বিধবাকে দেখে তার জন্য প্রভুর খুবইদয়া হল। তিনি তাকে বললেন, “তুমি কেঁদো না।” 14তারপর তিনি কাছে এসে শবের খাট ছুঁলেন, তখন যারা মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তারা দাঁড়িয়ে পড়ল। এমন সময় যীশু বললেন, “যুবক, আমি তোমায় বলছি তুমি ওঠো।” 15তখন সেই লোকটি উঠে বসল, আর কথা বলতে শুরু করল। যীশু তখন তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন।

16এই দেখে সকলের মন ভয় ও ভক্তিতে পূর্ণ হল। তারা ঈশ্বরের প্রশংসা করে বলতে লাগল, “আমাদের মধ্যে একজন মহান ভাববাদীর আবির্ভাব হয়েছে।” তারা আরও বলতে লাগল, “ঈশ্বর তাঁর লোকদের সাহায্য করতে এসেছেন।”

17যীশুর বিষয়ে এইসব কথা যিহূদিয়া ও তার আশপাশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল।

যোহনের জিজ্ঞাসা

(মথি 11:2-19)

18বাপ্তিস্মদাতা যোহনের অনুগামীরা এইসব ঘটনার কথা যোহনকে জানাল। তখন যোহন তার দুজন অনুগামীকে ডেকে 19প্রভুর কাছে জিজ্ঞেস করে পাঠালেন যে, “যাঁর আগমণের কথা আছে আপনিই কি সেই, না আমরা অন্য কারোর জন্য অপেক্ষা করব?”

20সেই লোকেরা যীশুর কাছে এসে বলল, “বাপ্তিস্মদাতা যোহন আপনার কাছে আমাদের জিজ্ঞেস করতে পাঠিয়েছেন। ‘যাঁর আসবার কথা আপনিই কি সেই ব্যক্তি, না আমরা অন্য কারো অপেক্ষায় থাকব?’”

21সেই সময় যীশু অনেক লোককে বিভিন্ন রোগ ও ব্যাধি থেকে সুস্থ করছিলেন, অশুচি আত্মায় পাওয়া লোকদের ভাল করছিলেন, আর অনেক অন্ধ লোককে দৃষ্টি শক্তি দান করছিলেন। 22তখন তিনি তাদের প্রশ্নের জবাবে বললেন, “তোমরা যা দেখলে ও শুনলে তা গিয়ে যোহনকে বল। অন্ধরা দেখতে পাচ্ছে, খোঁড়ারা হাঁটছে, কুষ্ঠ রোগীরা সুস্থ হচ্ছে, বধিররা শুনছে, মরা মানুষ বেঁচে উঠছে; আর দরিদ্ররা সুসমাচার শুনতে পাচ্ছে। 23ধন্য সেই লোক, যে আমাকে গ্রহণ করার জন্য মনে কোন দ্বিধা বোধ করে না।”

24যোহনের কাছ থেকে যারা এসেছিল তারা চলে গেলে পর যীশু সমবেত সেই লোকদের কাছে যোহনের বিষয়ে বললেন, “তোমরা প্রান্তরের মধ্যে কি দেখতে গিয়েছিলে? বাতাসে একটি বেত গাছ দুলছে তাই? 25তা না হলে কি দেখতে গিয়েছিলে? একজন লোক বেশ জমকালো পোশাক পরা? না। যারা দামী জামা কাপড় পরে এবং বিলাসে জীবন কাটায় তারা তো প্রাসাদে থাকে। 26তবে তোমরা কি দেখতে গিয়েছিলে? একজন ভাববাদীকে? হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, তোমরা যাকে দেখেছ তিনি একজন ভাববাদীর থেকেও মহান। 27ইনি সেই লোক যার বিষয়ে লেখা হয়েছে:

‘দেখ, আমি তোমার আগে আগে আমার এক সহায়ককে পাঠাচ্ছি।

সে তোমার আগে গিয়ে তোমার পথ প্রস্তুত করবে।’+ 7:27 উদ্ধৃতি মালাখি 3:1.

28আমি তোমাদের বলছি, স্ত্রীলোকের গর্ভজাত সকল মানুষের মধ্যে যোহনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই, তবু ঈশ্বরের রাজ্যে ক্ষুদ্রতম ব্যক্তিও যোহনের চেয়ে মহান।”

29(যারা যীশুর প্রচার শুনেছিল, তাদের মধ্যে পাপীষ্ঠরা ও কর আদায়কারীরাও যোহনের বাপ্তিস্ম নিয়ে স্বীকার করল যে ঈশ্বর ন্যায়পরায়ণ। 30কিন্তু ফরীশী ও ব্যবস্থার শিক্ষকরা যোহনের কাছে বাপ্তিস্ম নিতে অস্বীকার করে তাদের জীবনে ঈশ্বরের ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করল।)

31“তাহলে আমি কিসের সঙ্গে এই যুগের লোকদের তুলনা করব? এরা কেমন ধরণের লোক? 32এরা ছোট ছেলেদের মতো, যারা হাটে বসে একে অপরকে বলে,

‘আমরা তোমাদের জন্য বাঁশি বাজালাম,

কিন্তু তোমরা নাচলে না।

আমরা তোমাদের জন্য শোকগাথা গাইলাম,

কিন্তু তোমরা কাঁদলে না।’

33কারণ বাপ্তিস্মদাতা যোহন এসেছেন, তিনি রুটি খান না আর দ্রাক্ষারসও পান করেন না, আর তোমরা বল, ‘ওকে ভূতে পেয়েছে।’ 34মানবপুত্র এসে পানাহার করেন; আর তোমরা বল, ‘দেখ! ও পেটুক, মদ্যপায়ী, আবার পাপী ও কর আদায়কারীদের বন্ধু।’ 35প্রজা তার কাজের দ্বারাই প্রমাণ করে যে তা নির্দোষ।”

শিমোন ফরীশী

36একদিন একজন ফরীশী তার বাড়িতে যীশুকে নিমন্ত্রণ করল। তাই তিনি তার বাড়িতে গিয়ে সেখানে খাবার আসন নিলেন।

37সেই নগরে একজন দুশ্চরিত্রা স্ত্রীলোক ছিল। ফরীশীর বাড়িতে যীশু খেতে এসেছেন জানতে পেরে সে একটা শ্বেত পাথরের শিশিতে করে বহুমূল্য আতর নিয়ে এল। 38সে যীশুর পিছনে তাঁর পায়ের কাছে নতজানু হয়ে কেঁদে কেঁদে চোখের জলে তাঁর পা ভিজাতে লাগল। তারপর সে তার মাথার চুল দিয়ে তাঁর পা মুছিয়ে দিল, আর তাঁর পায়ে চুমু দিয়ে সেই আতর তাঁর পায়ে ঢেলে দিল।

39যে ফরীশী যীশুকে নিমন্ত্রণ করেছিল, এই দেখে সে মনে মনে বলল, “এই লোকটা যদি ভাববাদী হয় তবে নিশ্চয়ই বুঝতে পারত, যে তার পা ছুঁচ্ছে সে কে এবং কি ধরণের স্ত্রীলোক, এবং এও জানতে পারত যে স্ত্রীলোকটি পাপী।”

40এর জবাবে যীশু তাকে বললেন, “শিমোন, তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।”

শিমোন বলল, “বেশ তো গুরু, বলুন।”

41যীশু বললেন, “কোন এক মহাজনের কাছে দুজন লোক টাকা ধারত। একজন পাঁচশো রূপোর মুদ্রা আর একজন পঞ্চাশ রূপোর মুদ্রা। 42কিন্তু তারা কেউই ঋণ শোধ করতে না পারাতে তিনি দয়া করে উভয়ের ঋণই মকুব করে দিলেন। এখন এদের মধ্যে কে তাঁকে বেশী ভালবাসবে?”

43শিমোন বলল, “আমি মনে করি যার বেশী ঋণ মকুব করা হল সে-ই।”

যীশু তাকে বললেন, “তুমি ঠিক বলেছ।” 44এরপর যীশু সেই স্ত্রীলোকটির দিকে ফিরে শিমোনকে বললেন, “তুমি এই স্ত্রীলোকটিকে দেখছ? আমি তোমার বাড়িতে এলাম আর তুমি আমায় পা ধোবার জল পর্যন্ত দিলে না। কিন্তু ও চোখের জলে আমার পা ধুইয়ে দিল আর নিজের চুল দিয়ে তা মুছিয়ে দিল। 45স্বাগত জানাবার প্রথা অনুসারে তুমি আমায় চুমু দিলে না; কিন্তু আমি আসার পর থেকেই সে আমার পায়ে চুমু দিয়ে চলেছে। 46তুমি আমার মাথায় তেল দিয়ে অভিষেক করলে না; কিন্তু সে আমার পায়ে সুগন্ধি আতর ঢেলে তা অভিষিক্ত করল। 47এতেই বোঝা যায় যে সে বেশী ভালবাসা দেখাচ্ছে, সেইজন্যই আমি বলছি, এর পাপ অনেক হলেও তা ক্ষমা করা হয়েছে; কিন্তু যাকে অল্প ক্ষমা করা হয়, সে অল্প ভালবাসে।”

48এরপর যীশু সেই স্ত্রী লোকটিকে বললেন, “তোমার পাপের ক্ষমা হল।”

49যারা তাঁর সঙ্গে খেতে বসেছিল, তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, “ইনি কে যে পাপ ক্ষমা করেন?”

50কিন্তু যীশু সেই স্ত্রী লোকটিকে বললেন, “তোমার বিশ্বাসই তোমায় মুক্ত করেছে, তোমার শান্তি হোক্।”

8

অনুগামীদের সঙ্গে যীশু

1এরপর যীশু গ্রামে ও নগরে নগরে ঘুরে ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করতে লাগলেন; তাঁর সঙ্গে ছিলেন সেই বারোজন প্রেরিত। 2এমন কয়েকজন স্ত্রীলোকও তাঁর সঙ্গে ছিলেন, যারা নানারকম রোগ ব্যাধি থেকে সুস্থ হয়েছিলেন ও অশুচি আত্মার কবল থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন মরিয়ম মগ্দলীনী, এর মধ্যে থেকে যীশু সাতটি মন্দ আত্মা দূর করে দিয়েছিলেন। 3রাজা হেরোদের বাড়ির অধ্যক্ষ কূষের স্ত্রী শোশন্না ও আরো অনেক স্ত্রীলোক ছিলেন। যীশু ও তাঁর শিষ্যদের সেবা যত্নের জন্য এঁরা নিজেদের টাকা খরচ করতেন।

যীশু বীজ বোনার দৃষ্টান্তমূলক গল্প বললেন

(মথি 13:1-17; মার্ক 4:1-12)

4সেই সময় বিভিন্ন শহর থেকে দলে দলে লোক এসে যীশুর কাছে জড়ো হচ্ছিল, তখন যীশু তাদের উপদেশ দিতে গিয়ে এই দৃষ্টান্তটি বললেন:

5“একজন চাষী বীজ বুনতে গেল। সে যখন বীজ বুনছিল তখন কিছু পথের পাশে পড়ল, আর লোকে তা মাড়িয়ে গেল, পাখিতে তা খেয়ে গেল। 6কিছু বীজ পাথুরে জমির ওপর পড়ল, সেই বীজগুলো থেকে অঙ্কুর বার হল বটে, কিন্তু মাটিতে রস না থাকায় তা শুকিয়ে গেল। 7কিছু বীজ ঝোপের মধ্যে পড়ল। কাঁটাগাছ বেড়ে উঠে চারাগুলিকে চেপে দিল। 8আবার কিছু বীজ ভাল জমিতে পড়ল, সেগুলি বেড়ে উঠলে যা বোনা হয়েছিল তার একশো গুণ বেশী ফসল হল।”

এই কথা বলার পর তিনি চিৎকার করে বললেন, “যার শোনবার মত কান আছে, সে শুনুক।”

9তাঁর শিষ্যেরা তাঁকে এই দৃষ্টান্তটির অর্থ কি তা জিজ্ঞেস করলেন।

10তখন যীশু তাঁদের বললেন, “ঈশ্বরের রাজ্যের নিগূঢ় তত্ত্ব তোমাদের জানতে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বাকি সকলের কাছে দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বলা হয়েছে:

‘যেন তারা দেখেও না দেখে,

শুনেও না বোঝে।’+ 8:10 উদ্ধৃতি যিশাইয় 6:9.

যীশুর বীজের দৃষ্টান্তের ব্যাখ্যা

(মথি 13:18-23; মার্ক 4:13-20)

11“দৃষ্টান্তটির অর্থ এই, বীজ হল ঈশ্বরের শিক্ষা। 12যে বীজ পথের ধারে পড়েছিল তা এমন লোকদের বোঝায়, যারা শোনে, তারপর দিয়াবল এসে তাদের অন্তর থেকে ঈশ্বরের শিক্ষা হরণ করে নিয়ে যায়, যেন তারা বিশ্বাস করে মুক্তি না পায়। 13যে বীজ পাথুরে জমিতে পড়েছিল তা এমন লোকদের বোঝায়, যারা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের সঙ্গে তা গ্রহণ করে; কিন্তু মাটি না থাকাতে তাদের কোন শিকড় গজায়না। কিছু দিনের জন্য তারা বিশ্বাস করে বটে; কিন্তু কঠিন পরীক্ষার সময় তারা পিছিয়ে যায়।

14“কাঁটা ঝোপের মধ্যে যে বীজ পড়ল তা সেই সব লোককে বোঝায়, যারা শোনে; কিন্তু পরে জগত সংসারের চিন্তা ভাবনা, ধন-সম্পত্তি ও সুখভোগের মধ্যে তা চাপা পড়ে যায়, আর তারা কখনও ভাল ফল উৎপন্ন করে না। 15যে বীজ ভাল জমিতে পড়ল তা হচ্ছে সেই সব লোকের প্রতীক যাদের অন্তর সত্যতা ও সরলতায় ভরা, তারা যখন ঈশ্বরের শিক্ষা শোনে তখন তা ধরে রাখে, আর স্থির থেকে জীবনে ফল উৎপন্ন করে।

তোমাদের বোধশক্তি ব্যবহার কর

(মার্ক 4:21-25)

16“কেউ বাতি জ্বেলে তা কোন পাত্র দিয়ে ঢেকে রাখে না, অথবা খাটের নীচে রাখে না। তার পরিবর্তে সে তা বাতিদানের ওপরই রাখে, যেন ভেতরে যারা আসে তারা আলো দেখতে পায়। 17এমন কিছু লুকানো নেই যা প্রকাশ পাবে না, এমন কিছু গোপন নেই যা জানা যাবে না কিংবা আলোয় ফুটে উঠবে না। 18তাই কিভাবে শুনছ তাতে মন দাও, কারণ যার আছে তাকে আরো দেওয়া হবে। আর যার নেই তার যা আছে বলে সে মনে করে, তাও তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে।”

যীশুর অনুগামীরাই তাঁর পরিবার

(মথি 12:46-50; মার্ক 3:31-35)

19এই সময় যীশুর মা ও ভাইরা তাঁকে দেখতে এসেছিলেন; কিন্তু ভীড়ের জন্য তাঁরা যীশুর কাছে পৌঁছাতে পারলেন না। 20তখন একজন লোক তাঁকে বলল, “আপনার মা ও ভাইরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।”

21কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “তারাই আমার মা, আমার ভাই, যাঁরা ঈশ্বরের শিক্ষা শুনে সেই অনুসারে কাজ করে।”

যীশুর শিষ্যরা তাঁর ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করলেন

(মথি 8:23-27; মার্ক 4:35-41)

22সেই সময় একদিন যীশু তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে একটি নৌকায় উঠলেন। তিনি তাঁদের বললেন, “চল, আমরা হ্রদের ওপারে যাই।” তাঁরা রওনা দিলেন। 23নৌকা চলতে থাকলে যীশু নৌকার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন। হ্রদের মধ্যে হঠাৎ‌ ঝড় উঠল আর তাঁদের নৌকাটি জলে ভর্ত্তি হয়ে যেতে লাগল, এতে তাঁরা খুবই বিপদে পড়লেন। 24তখন শিষ্যরা যীশুর কাছে এসে তাঁকে জাগিয়ে তুলে বললেন, “গুরু! গুরু! আমরা যে সত্যিই ডুবতে বসেছি।”

তখন যীশু উঠে ঝোড়ো বাতাস ও তুফানকে ধমক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঝড় ও তুফান থেমে গেল, আর সব কিছু শান্ত হল। 25তখন যীশু তাঁর অনুগামীদের বললেন, “তোমাদের বিশ্বাস কোথায়?”

কিন্তু তাঁরা ভয়ে ও বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন, “ইনি কে যে ঝড় এবং সমুদ্রকে হুকুম করেন আর তারা তাঁর কথা শোনে!”

ভূতে পাওয়া এক ব্যক্তি

(মথি 8:28-34; মার্ক 5:1-20)

26এরপর তাঁরা গালীল হ্রদের ওপারে গেরাসেনীদের অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছালেন। 27যীশু যখন তীরে নামছেন, সেই সময় সেই নগর থেকে একজন লোক তাঁর সামনে এল। এই লোকটির মধ্যে অনেকগুলো মন্দ আত্মা ছিল। বহুদিন ধরে সে জামা কাপড় পরত না ও বাড়িতে থাকত না কিন্তু কবরখানায় থাকত।

28 সে যীশুকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল ও তাঁর সামনে এসে উপুড় হয়ে পড়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, “পরমেশ্বরের পুত্র যীশু, আমাকে নিয়ে আপনার কি কাজ, আমি আপনাকে মিনতি করছি, আমায় যন্ত্রণা দেবেন না।” সে এই কথা বলল, কারণ যীশু সেই ভূতকে তার মধ্য থেকে বার হয়ে যাবার জন্য হুকুম করলেন। সেই ভূত প্রায়ই লোকটাকে চেপে ধরত, তাকে বেড়ি ও শেকল দিয়ে বেঁধে রাখলেও তা ছিঁড়ে ফেলে ভূত তাকে প্রান্তরে তাড়িয়ে নিয়ে যেত।

30তখন যীশু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কি?”

সে বলল, “বাহিনী!” (কারণ অনেকগুলো ভূত একসঙ্গে তার মধ্যে ঢুকেছিল।) 31তারা যীশুকে মিনতির সুরে বলল, যেন তিনি তাদের রসাতলে যাওযার হুকুম না করেন। 32সেই সময় পাহাড়ের ঢালে একপাল শুয়োর চরছিল। সেই ভূতরা যীশুকে মিনতি করে বলল যেন তিনি তাদেরকে ঐ শুয়োরের পালে ঢোকার অনুমতি দেন। যীশু তখন তাদের সেই অনুমতি দিলেন। 33তাতে ভূতরা সেই লোকটির ভেতর থেকে বেরিয়ে ঐ শুয়োরগুলোর মধ্যে ঢুকল, আর সেই শুয়োরের পাল হ্রদের ঢাল দিয়ে জোরে দৌড়ে গিয়ে জলে ডুবে মরল।

34যারা শুয়োরের পাল চরাচ্ছিল, এই ঘটনা দেখে তারা দৌড়ে গিয়ে সেই নগরে ও সারা দেশে এই খবর দিল; 35আর কি হয়েছে তা দেখবার জন্য লোকরা বাইরে এল। তারা যীশুর কাছে এসে দেখল, যার মধ্যে থেকে ভূতগুলো বার হয়েছে সে কাপড় পরে শান্তভাবে যীশুর পায়ের কাছে বসে আছে। এই দেখে তারা ভয় পেয়ে গেল। 36যারা এই ঘটনা দেখেছিল তারা ঐ লোকদের কাছে বলল, কেমন করে ঐ ভূতে পাওয়া লোকটি সুস্থ হল। 37তখন গেরাসেনী অঞ্চলের সমস্ত লোক যীশুকে তাদের কাছ থেকে চলে যেতে অনুরোধ করল, কারণ তারা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

তখন যীশু ফিরে যাবার জন্য নৌকায় উঠলেন। 38তখন যে লোকটির মধ্য থেকে ভূত বার হয়ে গিয়েছিল, সে যীশুর সঙ্গে যাবার জন্য মিনতি করতে লাগল। কিন্তু যীশু তাকে অনুমতি দিলেন না। 39তিনি বললেন, “তুমি বাড়ি ফিরে যাও; আর ঈশ্বর তোমার জন্য যা করেছেন তা সকলকে বল।”

তখন সে সেখান থেকে চলে গেল, আর যীশু তার জন্য যা করেছেন তা সারা শহরে বলে বেড়াতে লাগল।

মৃত বালিকাকে জীবন দান ও স্ত্রীলোককে আরোগ্যদান

(মথি 9:18-26; মার্ক 5:21-43)

40যীশু যখন ফিরে এলেন তখন এক বিরাট জনতা তাঁকে স্বাগত জানাল, কারণ তারা সকলে যীশুর ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল। 41 ঠিক সেই সময় যায়ীর নামে একজন লোক সেখানে এলেন, ইনি সেখানকার সমাজগৃহের নেতা। তিনি যীশুর পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়ে তাঁকে অনুরোধ করলেন, যেন যীশু তাঁর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে যান। কারণ তখন তাঁর একমাত্র সন্তান, বারো বছরের মেয়েটি মৃত্যুশয্যায় ছিল।

যীশু যখন যাচ্ছিলেন, লোকেরা তাঁর চারদিকে ভীড় করে ধাক্কা-ধাক্কি করতে লাগল। 43সেই ভীড়ের মধ্যে একজন স্ত্রীলোক ছিল যে বারো বছর ধরে রক্তস্রাব রোগে ভুগছিল। চিকিৎসকদের পিছনে সে তার যথাসর্বস্ব ব্যয় করেছিল,+ 8:43 চিকিৎসকদের … করেছিল কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে এই শব্দ নাই। কিন্তু কেউ তাকে ভাল করতে পারে নি। 44সে যীশুর পেছন দিকে এসে তাঁর পোশাকের ঝালর স্পর্শ করল, সঙ্গে সঙ্গে তার রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে গেল। 45তখন যীশু বললেন, “কে আমাকে স্পর্শ করল?”

সবাই অস্বীকার করল, তখন পিতর বললেন, “গুরু, লোকেরা আপনার চারপাশে ধাক্কা-ধাক্কি করে আপনার ওপর পড়ছে।”

46কিন্তু যীশু বললেন, “কেউ আমায় স্পর্শ করেছে! কারণ আমি জানি আমার মধ্যে থেকে শক্তি বার হয়েছে।” 47সেই স্ত্রীলোকটি যখন দেখল যে সে কোনমতেই এড়িয়ে যেতে পারবে না, তখন কাঁপতে কাঁপতে যীশুর কাছে এসে তার সামনে উপুড় হয়ে পড়ল এবং সকলের সামনে বলল কেন সে যীশুকে স্পর্শ করেছে, আর কিভাবে সঙ্গে সঙ্গে ভাল হয়ে গেছে। 48তখন যীশু সেই স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “তোমার বিশ্বাসই তোমাকে সুস্থ করেছে, তোমার শান্তি হোক্।”

49তিনি তখনও কথা বলছেন, এমন সময় সমাজ-গৃহের নেতার বাড়ি থেকে একজন এসে বলল, “আপনার মেয়ে মারা গেছে! গুরুকে আর কষ্ট দেবেন না।”

50যীশু এই কথা শুনতে পেয়ে সমাজ-গৃহের নেতাকে বললেন, “ভয় পেও না! কেবল বিশ্বাস রাখো, সে নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠবে।”

51যীশু সেই বাড়িতে পৌঁছে পিতর, যাকোব, যোহন ও মেয়েটির মা-বাবা ছাড়া আর কাউকে সেই ঘরে ঢুকতে দিলেন না। 52সেখানে অনেক লোক মেয়েটির জন্য শোক করছিল ও কাঁদছিল। যীশু তাদের বললেন, “কান্না বন্ধ কর, কারণ ও তো মরে নি, ও ঘুমোচ্ছে।”

53তাঁর কথা শুনে লোকেরা হাসাহাসি করতে লাগল, কারণ তারা জানত মেয়েটি মারা গেছে। 54যীশু মেয়েটির হাত ধরে ডাক দিলেন, “খুকুমনি ওঠ!” 55সেই মুহূর্তে তার আত্মা ফিরে এল, আর সে উঠে দাঁড়াল। যীশু তাদের আদেশ করলেন, “যেন তাকে কিছু খেতে দেওয়া হয়।” 56মেয়েটির মা বাবা খুবই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যীশু তাদের বারণ করলেন যেন তারা এই ঘটনার কথা কাউকে না বলে।

9

যীশু সেই বারোজন প্রেরিতকে পাঠালেন

(মথি 10:5-15; মার্ক 6:7-13)

1যীশু সেই বারোজন প্রেরিতকে ডেকে তাঁদের সব রকমের ভূত তাড়াবার ক্ষমতা ও নানান রোগ ভাল করার ক্ষমতা দিলেন। 2এরপর তিনি তাঁদের ঈশ্বরের রাজ্যের বিষয় প্রচার করতে ও রোগীদের সুস্থ করার জন্য পাঠালেন। 3তিনি তাঁদের বললেন, “তোমরা যাত্রা পথের জন্য কিছুই নিও না, পথে যাবার জন্য লাঠি, ঝুলি, খাবার বা টাকা পয়সা কিছুই নিও না, এমন কি দুটো জামাও না। 4যে বাড়িতে তোমরা প্রবেশ করবে, সেই গ্রাম ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত সেই বাড়িতেই থেকো। 5যেখানে লোকেরা তোমাদের স্বাগত জানাবে না সেখানে শহর ছেড়ে অন্যত্র যাবার সময় তাদের বিরুদ্ধে প্রামাণিক সাক্ষ্যস্বরূপ তোমাদের পায়ের ধূলো ঝেড়ে ফেলো।”

6তখন তাঁরা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যেতে যেতে ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচার ও রোগীদের সুস্থ করতে লাগলেন।

হেরোদ যীশু সম্পর্কে সন্দিহান

(মথি 14:1-12; মার্ক 6:14-29)

7সেই সময় যে সব ঘটনা ঘটছিল রাজ্যপাল হেরোদ তা শুনে খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। কারণ কেউ কেউ বলছিল, “যোহন আবার বেঁচে উঠেছেন।” 8আবার অনেকে বলছিল, “এলিয় পুনরায় আবির্ভূত হয়েছেন।” কেউ কেউ বলছিল, “প্রাচীনকালের ভাববাদীদের মধ্যে কোন একজন পুনরায় মৃতদের মধ্য থেকে উত্থাপিত হয়েছেন।” 9কিন্তু হেরোদ বললেন, “আমি যোহনের মাথা কেটে ফেলেছি; কিন্তু যার বিষয়ে আমি এসব কথা শুনছি, এ তবে কে?” আর তিনি যীশুকে দেখবার চেষ্টা করতে লাগলেন।

যীশু পাঁচ হাজারের বেশী লোককে খাওয়ালেন

(মথি 14:13-21; মার্ক 6:30-44; যোহন 6:1-14)

10প্রেরিতরা ফিরে এসে তাঁরা কি কি করেছেন তা যীশুকে জানালেন। তখন যীশু তাঁদের নিয়ে নিভৃতে বৈৎসৈদা নগরে চলে গেলেন। 11কিন্তু লোকেরা জানতে পেরে গেল যে তিনি কোথায় যাচ্ছেন, আর তারা যীশুর পিছু পিছু চলল। যীশুও তাদের সাদরে গ্রহণ করে তাদের কাছে ঈশ্বরের রাজ্যের বিষয়ে বললেন, আর যে সব লোকের রোগ-ব্যাধি ভাল হবার প্রয়োজন ছিল, তাদের সুস্থ করলেন।

12দিন প্রায় শেষ হয়ে আসছে, এমন সময় সেই বারোজন প্রেরিত যীশুর কাছে ফিরে এসে বললেন, “আমরা যেখানে আছি এটা একটা নির্জন স্থান, তাই এই লোকদের বিদায় দিন যেন এরা আশপাশের গ্রামে গিয়ে নিজেদের জন্য থাকবার স্থান ও খাবার জোগাড় করে নিতে পারে।”

13কিন্তু যীশু তাঁদের বললেন, “তোমরাই এদের খেতে দাও।”

কিন্তু তারা বললেন, “আমাদের কাছে তো পাঁচখানা রুটি আর দুটো মাছ ছাড়া আর কিছুই নেই। আমরা গিয়ে কি এইসব লোকদের জন্য খাবার কিনে আনব?” 14(সেখানে পুরুষ মানুষই ছিল প্রায় পাঁচ হাজার।)

কিন্তু যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন, “ওদেরকে এক এক দলে পঞ্চাশ জন করে বসিয়ে দাও।”

15তারা সেই রকমই করলেন; তাদের সকলকেই বসিয়ে দিলেন। 16এরপর যীশু সেই পাঁচখানা রুটি ও দুটো মাছ নিয়ে সেগুলোর জন্য স্বর্গের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। পরে তিনি সেগুলোকে টুকরো টুকরো করে তা পরিবেশন করার জন্য শিষ্যদের হাতে দিলেন। 17সকলে বেশ তৃপ্তি করে খেল, বাকি যা পড়ে রইল তা একসঙ্গে জড় করলে বারোটি টুকরি ভরে গেল।

যীশুই খ্রীষ্ট

(মথি 16:13-19; মার্ক 8:27-29)

18একদিন যীশু কোন এক জায়গায় নিভৃতে প্রার্থনা করছিলেন। তাঁর শিষ্যরা সেখানে এলে তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “লোকেরা কি বলে, আমি কে?”

19তাঁরা বললেন, “কেউ কেউ বলে আপনি বাপ্তিস্মদাতা যোহন, কেউ বা বলে এলিয়, আবার কেউ কেউ বলে প্রাচীনকালের ভাববাদীদের মধ্যে একজন বেঁচে উঠেছেন।”

20তিনি তাঁদের বললেন, “কিন্তু তোমরা কি বল, আমি কে?”

পিতর বললেন, “ঈশ্বরের সেই খ্রীষ্ট।”

21তখন তিনি তাঁদের সতর্ক করে দিলেন যেন একথা তাঁরা কারো কাছে প্রকাশ না করেন।

যীশু বললেন যে তাঁকে মৃত্যুবরণ করতেই হবে

(মথি 16:21-28; মার্ক 8:31-9:1)

22তিনি আরো বললেন, “মানবপুত্রের অনেক দুঃখ ও যাতনা ভোগ করার প্রয়োজন আছে; ইহুদী নেতারা, প্রধান যাজকেরা ও ব্যবস্থার শিক্ষকরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে, তারা তাঁকে হত্যা করবে; আর তিন দিনের মাথায় তিনি মৃত্যুলোক থেকে পুনরুত্থিত হবেন।”

23পরে তিনি তাঁদের সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “যদি কেউ আমার সঙ্গে আসতে চায়, তবে সে নিজেকে অস্বীকার করুক; আর প্রতিদিন নিজের ক্রুশ তুলে নিক এবং আমায় অনুসরণ করুক। 24যে কেউ নিজের জীবন রক্ষা করতে চায় সে তা হারাবে, কিন্তু যে কেউ আমার জন্য নিজের জীবন হারায় সে তা রক্ষা করবে। 25সমগ্র জগৎ‌ লাভ করে কেউ যদি নিজেকে ধ্বংস করে তবে তার কি লাভ হল? 26যদি কেউ আমার জন্য ও আমার শিক্ষার জন্য লজ্জা বোধ করে, তবে যখন মানবপুত্র নিজ মহিমায় এবং পিতা ও পবিত্র স্বর্গদূতদের মহিমায় আসবেন তখন তিনিও তার জন্য লজ্জিত হবেন। 27কিন্তু আমি তোমাদের সত্যি বলছি, এখানে এমন কয়েকজন আছে যাঁরা ঈশ্বরের রাজ্য না দেখা পর্যন্ত মৃত্যুর মুখ দেখবে না।”

মোশি, এলিয় ও যীশু

(মথি 17:1-8; মার্ক 9:2-8)

28এইসব কথা বলার প্রায় আট দিন পর, তিনি পিতর, যাকোব ও যোহনকে নিয়ে প্রার্থনা করার জন্য একটা পর্বতে গেলেন। 29যীশু যখন প্রার্থনা করছিলেন, তখন তাঁর মুখের চেহারা অন্যরকম হয়ে গেল, তাঁর পোশাক আলোক শুভ্র হয়ে উঠল। 30দুই ব্যক্তি, মোশি ও এলিয় মহিমান্বিত হয়ে সেখানে এসে যীশুর সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। 31তাঁরা ঈশ্বরের পরিকল্পনা অনুযায়ী জেরুশালেমে কিভাবে যীশুর মৃত্যু হবে তাই নিয়ে কথা বলছিলেন। 32কিন্তু পিতর ও তাঁর অন্য সঙ্গীরা সেই সময় ঢুলতে ঢুলতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা জেগে উঠে যীশুকে মহিমান্বিত রূপে দেখতে পেলেন, আর ঐ দুই ব্যক্তিকে যীশুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। 33সেই ব্যক্তিরা যখন যীশুর কাছ থেকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন পিতর যীশুকে বললেন, “গুরু, ভালোই হয়েছে যে আমরা এখানে আছি। আমরা এখানে তিনটে কুটীর তৈরী করি, একটা আপনার জন্য, একটা মোশির জন্য আর একটা এলিয়র জন্য।” তিনি জানতেন না যে তিনি কি বলছিলেন।

34কিন্তু তিনি যখন এইসব কথা বলছিলেন, সেই সময় এক খণ্ড মেঘ এসে তাঁদের ঢেকে ফেলল, মেঘের মধ্যে প্রবেশ করে তাঁরা ভীত হলেন। 35সেই মেঘের মধ্য থেকে এক রব শোনা গেল। সেই রব বলল, “এই আমার পুত্র, আমার মনোনীত পাত্র, তাঁর কথা শোন।”

36সেই রব মিলিয়ে যাবার পরই দেখা গেল কেবল যীশু একা সেখানে রয়েছেন আর শিষ্যরা যা দেখলেন সে বিষয়ে কাউকে কিছু না বলে চুপ করে রইলেন।

অশুচি আত্মায় পাওয়া একটি বালককে যীশু সুস্থ করলেন

(মথি 17:14-18; মার্ক 9:14-27)

37পরদিন তাঁরা পর্বত থেকে নেমে এলে বহু লোক যীশুর সঙ্গে দেখা করতে এল, 38আর সেই সময় ঐ ভীড়ের মধ্য থেকে একটি লোক চিৎকার করে বলল, “গুরু, আমি আপনাকে মিনতি করছি আপনি আমার এই একমাত্র সন্তানের দিকে একটু দেখুন। 39হঠাৎ‌, একটা অশুচি আত্মা তাকে ধরে, আর সে চিৎকার করতে থাকে। সেই আত্মা যখন তাকে মুচড়ে ধরে তখন তার মুখ থেকে ফেনা কাটতে থাকে। এটা সহজে তাকে ছেড়ে যেতে চায় না, তাকে একবারে ঝাঁঝরা করে দেয়। 40আমি আপনার শিষ্যদের কাছে মিনতি করেছিলাম যেন তাঁরা ঐ অশুচি আত্মাকে তাড়িয়ে দেন, কিন্তু তাঁরা পারলেন না।”

41যীশু বললেন, “হে অবিশ্বাসী ও পথভ্রষ্ট লোকেরা, আমি আর কতকাল তোমাদের নিয়ে ধৈর্য্য ধরব, কতকালই বা তোমাদের সঙ্গে থাকব?” যীশু লোকটিকে বললেন, “তোমার ছেলেকে এখানে আন।”

42ছেলেটা যখন আসছিল, তখন সেই ভূত তাকে আছাড় মারল আর তাতে সে প্রবলভাবে হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করতে লাগল। যীশু সেই অশুচি আত্মাকে ধমক দিলেন। তারপর ছেলেটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তার বাবার কাছে ফেরৎ দিলেন। 43ঈশ্বর যে কত মহান তা দেখে লোকেরা অবাক হয়ে গেল।

যীশু তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে বললেন

(মথি 17:22-23; মার্ক 9:30-32)

যীশু যা করলেন তা দেখে লোকেরা আশ্চর্য হচ্ছিল, তখন যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন, 44“আমি তোমাদের যা বলছি তা মন দিয়ে শোন, শীঘ্রই মানবপুত্রকে মানুষের হাতে সঁপে দেওয়া হবে।” 45কিন্তু এ কথার অর্থ কি শিষ্যরা তা বুঝতে পারলেন না। এটা তাঁদের কাছে গুপ্ত রয়ে গেল, তাই তাঁরা এর কিছুই উপলদ্ধি করতে পারলেন না।

শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি

(মথি 18:1-5; মার্ক 9:33-37)

46সেই সময়ই তাঁদের মধ্যে এই বিতর্কের সূত্রপাত হল যে কে তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। 47কিন্তু যীশু তাঁদের মনোভাব বুঝতে পেরে একটি শিশুকে এনে নিজের পাশে দাঁড় করালেন। 48তিনি তাঁদের বললেন, “যে কেউ আমার নামে এই শিশুকে সাদরে গ্রহণ করে, সে আমাকেই গ্রহণ করে; আর যে আমাকে সাদরে গ্রহণ করে, সে আমাকে যিনি পাঠিয়েছেন তাঁকেই গ্রহণ করে। তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোট, সেই শ্রেষ্ঠ।”

যে কেউ তোমার বিপক্ষে নয় সে তোমার পক্ষে

(মার্ক 9:38-40)

49যোহন বললেন, “প্রভু আমরা আপনার নামে একজনকে ভূত তাড়াতে দেখেছি। সে আমাদের সঙ্গী নয় বলে আমরা তাকে বারণ করেছি।”

50কিন্তু যীশু তাঁকে বললেন, “তাকে বারণ করো না, কারণ যে তোমাদের বিপক্ষ নয়, সে তোমাদের সপক্ষ।”

শমরীয় শহর

51যীশুর স্বর্গে যাবার সময় হয়ে এলে তিনি স্থির চিত্তে জেরুশালেমের দিকে এগিয়ে চললেন। 52তিনি তাঁর পৌঁছাবার আগেই সেখানে কিছু বার্তবাহক পাঠালেন। তাঁরা গিয়ে শমরীয়দের এক গ্রামে উঠলেন, যেন যীশুর জন্য সব কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন। 53কিন্তু যীশু জেরুশালেমে যাবেন বলে স্থির করায় শমরীয়রা তাঁকে গ্রহণ করল না। 54যীশুর অনুগামী যাকোব ও যোহন এই দেখে বললেন, “প্রভু, আপনি কি চান যে এদের ধ্বংস করার জন্য আমরা আকাশ থেকে আগুন নামিয়ে আনি?”+ 9:54 কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে পদ 54 যুক্ত করা হয়েছে: “যেমন এলিয় করেছিল?”

55কিন্তু যীশু ফিরে দাঁড়িয়ে তাদের ধমক দিলেন।+ 9:55 কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে পদ 55 যুক্ত করা হয়েছে: এবং “যীশু বললেন, ‘তোমরা কোন্ আত্মার তা জান না। 56 মানবপুত্র আত্মাকে ধ্বংস করতে আসেন নি, কিন্ত এসেছেন রক্ষা করতে।’”56তখন তাঁরা অন্য গ্রামে গেলেন।

যীশুকে অনুসরণ

(মথি 8:19-22)

57তাঁরা যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, সেই সময় একজন লোক যীশুকে বলল, “আপনি যেখানেই যান না কেন আমিও আপনার সঙ্গে যাব।”

58যীশু তাকে বললেন, “শেয়ালের গর্ত আছে, আকাশের পাখিদেরও বাসা আছে, কিন্তু মানবপুত্রের কোথাও মাথা রাখার ঠাঁই নেই।”

59আর একজনকে তিনি বললেন, “আমায় অনুসরণ কর।”

কিন্তু সেই লোকটি বলল, “আগে গিয়ে আমার বাবাকে কবর দিয়ে আসতে দিন।”

60কিন্তু যীশু তাকে বললেন, “মৃতরাই তাদের মৃতদের কবর দেবে। তুমি গিয়ে বরং ঈশ্বরের রাজ্যের বিষয় ঘোষণা কর।”

61আর একজন লোক বলল, “প্রভু, আমি আপনার অনুসারী হব: কিন্তু প্রথমে আমার বাড়ির সকলকে বিদায় জানিয়ে আসতে দিন।”

62কিন্তু যীশু তাকে বললেন, “লাঙ্গলে হাত রেখে যে পেছন ফিরে তাকায়, সে ঈশ্বরের রাজ্যের যোগ্য নয়।”

10

যীশু বাহাত্তর জন লোককে পাঠালেন

1এরপর প্রভু আরও বাহাত্তর+ 10:1 বাহাত্তর কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে সত্তর লেখা আছে: আবার কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে বাহাত্তর সংখ্যাটি পাওয়া যায়। জন লোককে মনোনীত করলেন। তিনি নিজে যে সমস্ত নগরে ও যে সমস্ত জায়গায় যাবেন বলে ঠিক করেছিলেন, সেই সব জায়গায় তাঁদের দুজন দুজন করে পাঠিয়ে দিলেন। 2তিনি তাঁদের বললেন, “শস্য প্রচুর হয়েছে, কিন্তু তা কাটার জন্য মজুরের সংখ্যা অল্প, তাই শস্যের যিনি মালিক তাঁর কাছে প্রার্থনা কর, যেন তিনি তাঁর ফসল কাটার জন্য মজুর পাঠান।

3“যাও! আর মনে রেখো, নেকড়ে বাঘের মধ্যে ভেড়ার মতোই আমি তোমাদের পাঠাচ্ছি। 4তোমরা টাকার বটুয়া, থলি বা জুতো সঙ্গে নিও না এবং পথের মধ্যে কাউকে শুভেচ্ছা জানিও না। 5যে বাড়িতে তোমরা প্রবেশ করবে সেখানে প্রথমে বলবে, ‘এই গৃহে শান্তি হোক্!’ 6সেখানে যদি শান্তির পাত্র কেউ থাকে, তবে তোমাদের শান্তি তার সহবর্তী হবে। কিন্তু যদি সেরকম কেউ না থাকে, তাহলে তোমাদের শান্তি তোমাদের কাছে ফিরে আসবে। 7যে বাড়িতে যাবে সেখানেই থেকো, আর তারা যা খেতে দেয় তাই খেও, কারণ যে কাজ করে সে বেতন পাবার যোগ্য। এ বাড়ি সে বাড়ি করে ঘুরে বেড়িও না।

8“তোমরা যখন কোন নগরে প্রবেশ করবে তখন সেই নগরের লোকেরা যদি তোমাদের স্বাগত জানায়, তবে সেখানকার লোকেরা তোমাদের সামনে যা কিছু ধরে, তা খেও। 9সেই নগরের রোগীদের সুস্থ করো ও সেখানকার লোকদের বলো, ‘ঈশ্বরের রাজ্য তোমাদের কাছে এসে পড়েছে।’

10“তোমরা কোন নগরে প্রবেশ করলে যদি সেই নগরের লোকেরা তোমাদের স্বাগত না জানায়, তবে সেখানকার রাস্তায় বেরিয়ে এসে তোমরা বলো, 11‘এমনকি তোমাদের নগরের যে ধূলো আমাদের পায়ে লেগেছে তা আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে ঝেড়ে ফেললাম; তবে একথা জেনে রেখো যে ঈশ্বরের রাজ্য তোমাদের কাছে এসে গেছে।’ 12আমি তোমাদের বলছি, সেই দিন এই নগরের থেকে সদোমের লোকদের অবস্থা অনেক বেশী সহনীয় হবে।

অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে যীশুর সতর্কবাণী

(মথি 11:20-24)

13“কোরাসীন ধিক্ তোমাকে! বৈৎসৈদা ধিক্ তোমাকে! তোমাদের মধ্যে যে সব অলৌকিক কাজ করা হয়েছে তা যদি সোর ও সীদোনে করা হত, তবে সেখানকার লোকেরা অনেক আগেই চটের বস্ত্র পরে মাথায় ভস্ম ছিটিয়ে অনুতাপ করতে বসত। 14যাইহোক্, বিচারের দিনে সোর সীদোনের অবস্থা বরং তোমাদের চেয়ে অনেক সহনীয় হবে। 15তুমি কফরনাহূম! তুমি কি স্বর্গ পর্যন্ত উন্নীত হবে? না! তোমাকে নরক পর্যন্ত নামানো হবে!

16“যারা তোমাদের কথা শোনে, তারা আমারই কথা শোনে; আর যারা তোমাদের অগ্রাহ্য করে, তারা আমাকেই অগ্রাহ্য করে। যারা আমাকে অগ্রাহ্য করে, তারা যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁকেই অগ্রাহ্য করে।”

শয়তানের পতন

17এরপর সেই বাহাত্তরজন আনন্দের সঙ্গে ফিরে এসে বললেন, “প্রভু, আপনার নামে এমন কি ভূতরাও আমাদের বশ্যতা স্বীকার করে!”

18তখন যীশু তাঁদের বললেন, “আমি শয়তানকে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো আকাশ থেকে পড়তে দেখলাম। 19শোন! সাপ ও বিছেকে পায়ে দলবার ক্ষমতা আমি তোমাদের দিয়েছি; আর তোমাদের শত্রুর সমস্ত শক্তির ওপরে ক্ষমতাও আমি তোমাদের দিয়েছি; কোন কিছুই তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। 20তবু আত্মারা যে তোমাদের বশীভূত হয়, এ জেনে আনন্দ করো না; কিন্তু স্বর্গে তোমাদের নাম লেখা হয়েছে বলে আনন্দ কর।”

পিতার নিকট যীশুর প্রার্থনা

(মথি 11:25-27; 13:16-17)

21ঠিক সেই মুহূর্তে পবিত্র আত্মার আনন্দে পূর্ণ হয়ে যীশু বললেন, “পিতা, আমি তোমার প্রশংসা করি, কারণ স্বর্গ ও পৃথিবীর প্রভু, তুমি এসব বিষয় জ্ঞানীগুণী ও বুদ্ধিমান লোকদের কাছে গোপন রেখে শিশুদের কাছে প্রকাশ করেছ। হ্যাঁ, পিতা, এতেই তোমার আনন্দ।

22“আমার পিতা আমায় সবই দিয়েছেন। পিতা ছাড়া আর কেউ জানে না পুত্র কে, আমার পুত্র ছাড়া আর কেউ জানে না পিতা কে। এছাড়া পুত্র যার কাছে পিতাকে প্রকাশ করতে ইচ্ছা করেন, কেবল সে-ই জানে।”

23এরপর শিষ্যদের দিকে ফিরে তিনি একান্তে তাঁদের বললেন, “তোমরা যা দেখছ, যে চোখ তা দেখতে পায় তা ধন্য! 24কারণ আমি তোমাদের বলছি, তোমরা যা দেখছ, অনেক ভাববাদী ও রাজা তা দেখার ইচ্ছা করলেও তা দেখতে পান নি; তোমরা যা শুনছ, তা শোনার ইচ্ছা করলেও তাঁরা তা শুনতে পান নি।”

দয়ালু শমরীয়ের দৃষ্টান্তমূলক কাহিনী

25এরপর একজন ব্যবস্থার শিক্ষক যীশুকে পরীক্ষার ছলে জিজ্ঞাসা করল, “গুরু, অনন্ত জীবন লাভ করার জন্য আমায় কি করতে হবে?”

26যীশু তাকে বললেন, “বিধি-ব্যবস্থায় এ বিষয়ে কি লেখা আছে? সেখানে তুমি কি পড়েছ?”

27সে জবাব দিল, “‘তোমার সমস্ত অন্তর, মন, প্রাণ ও শক্তি দিয়ে অবশ্যই তোমার প্রভু ঈশ্বরকে ভালবাসো।’+ 10:27 উদ্ধৃতি দ্বি. বি. 6:5. আর ‘তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালবাসো।’+ 10:27 উদ্ধৃতি লেবীয় 19:18.

28তখন যীশু তাকে বললেন, “তুমি ঠিক উত্তরই দিয়েছ; ঐ সবই কর, তাহলে অনন্ত জীবন লাভ করবে।”

29কিন্তু সে নিজেকে ধার্মিক দেখাতে চেয়ে যীশুকে জিজ্ঞেস করল, “আমার প্রতিবেশী কে?”

30এর উত্তরে যীশু বললেন, “একজন লোক জেরুশালেম থেকে যিরীহোর দিকে নেমে যাচ্ছিল, পথে সে ডাকাতের হাতে ধরা পড়ল। তারা লোকটির জামা কাপড় খুলে নিয়ে তাকে মারধোর করে আধমরা অবস্থায় সেখানে ফেলে রেখে চলে গেল।

31“ঘটনাক্রমে সেই পথ দিয়ে একজন ইহুদী যাজক যাচ্ছিল, যাজক তাকে দেখতে পেয়ে পথের অন্য ধার দিয়ে চলে গেল। 32সেই পথে এরপর একজন লেবীয়+ 10:32 লেবীয় লেবীয় সম্প্রদায়ভুক্ত এক ব্যক্তি। যিনি মন্দিরে ইহুদী যাজকদের সাহায্য করতেন। এল। তাকে দেখে সেও পথের অন্য ধার দিয়ে চলে গেল।

33“কিন্তু একজন শমরীয় ঐ পথে যেতে যেতে সেই লোকটির কাছাকাছি এল। লোকটিকে দেখে তার মমতা হল। 34সে ঐ লোকটির কাছে গিয়ে তার ক্ষতস্থান দ্রাক্ষারস দিয়ে ধুয়ে তাতে তেল ঢেলে বেঁধে দিল। এরপর সেই শমরীয় লোকটিকে তার নিজের গাধার ওপর চাপিয়ে একটি সরাইখানায় নিয়ে এসে তার সেবা যত্ন করল। 35পরের দিন সেই শমরীয় দুটি রৌপ্যমুদ্রা বার করে সরাইখানার মালিককে দিয়ে বলল, ‘এই লোকটির যত্ন করবেন আর আপনি যদি এর চেয়ে বেশী খরচ করেন, তবে আমি ফিরে এসে আপনাকে তা শোধ করে দেব।’”

36এখন বল, “এই তিন জনের মধ্যে সেই ডাকাত দলের হাতে পড়া লোকটির প্রকৃত প্রতিবেশী কে?”

37সে বলল, “যে লোকটি তার প্রতি দয়া করল।”

তখন যীশু তাকে বললেন, “সে যেমন করল, যাও তুমি গিয়ে তেমন কর।”

মরিয়ম ও মার্থা

38এরপর যীশু ও তাঁর শিষ্যরা জেরুশালেমের পথে যেতে যেতে কোন এক গ্রামে প্রবেশ করলেন। সেখানে মার্থা নামে একজন স্ত্রীলোক তাঁদের সাদর অভ্যর্থনা করলেন। 39মরিয়ম নামে তাঁর একটি বোন ছিল, তিনি যীশুর পায়ের কাছে বসে তাঁর শিক্ষা শুনছিলেন। 40কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার নানা রকম আয়োজন করতে মার্থা খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি যীশুর কাছে এসে বললেন, “প্রভু, আপনি কি দেখছেন না, আমার বোন সমস্ত কাজ একা আমার ঘাড়ে ফেলে দিয়েছে? ওকে বলুন ও যেন আমায় সাহায্য করে।”

41প্রভু তখন মার্থাকে বললেন, “মার্থা, মার্থা তুমি অনেক বিষয় নিয়ে বড়ই উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হয়ে পড়েছ। 42কিন্তু কেবলমাত্র একটা বিষয়ের প্রয়োজন আছে। আর মরিয়ম সেই উত্তম বিষয়টি মনোনীত করেছে, যা তার কাছ থেকে কখনও কেড়ে নেওয়া হবে না।”

11

প্রার্থনার বিষয়ে যীশুর শিক্ষা

(মথি 6:9-15)

1যীশু এক জায়গায় প্রার্থনা করছিলেন। প্রার্থনা শেষ হলে পর তাঁর একজন শিষ্য এসে তাঁকে বললেন, “প্রভু, যোহন যেমন তাঁর শিষ্যদের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছিলেন, আপনিও তেমনি আমাদের প্রার্থনা করতে শেখান।”

2তখন যীশু তাঁদের বললেন, “তোমরা যখন প্রার্থনা কর তখন বলো,

‘পিতা, তোমার পবিত্র নামের সমাদর হোক্,

তোমার রাজ্য আসুক।

3দিনের আহার তুমি প্রতিদিন আমাদের দাও।

4আমাদের পাপ ক্ষমা কর,

কারণ আমাদের বিরুদ্ধে যারা অন্যায় করেছে, আমরাও তাদের ক্ষমা করেছি,

আর আমাদের পরীক্ষায় পড়তে দিও না।’”

অনবরত যাঞ্চা কর

(মথি 7:7-11)

5 এরপর যীশু তাঁদের বললেন, “ধর, তোমাদের কারো একজন বন্ধু আছে। আর সে মাঝরাতে তার কাছে গিয়ে বলল, ‘বন্ধু আমায় খান তিনেক রুটি ধার দাও, কারণ আমার এক বন্ধু যাত্রাপথে এই মাত্র আমার ঘরে এসেছে, তাকে খেতে দেবার মতো ঘরে কিছু নেই।’ 7সেই লোক যদি ঘরের ভেতর থেকে উত্তর দেয়, ‘দেখ, আমায় বিরক্ত করো না! এখন দরজা বন্ধ আছে আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমি শুয়ে পড়েছি। আমি এখন তোমাকে কিছু দেবার জন্য উঠতে পারব না।’ 8আমি তোমাদের বলছি, সে যদি বন্ধু হিসাবে উঠে তাকে কিছু না দেয়, তবু লোকটি বার বার করে অনুরোধ করছে বলে সে উঠবে ও তার যা দরকার তা তাকে দেবে। 9তাই আমি তোমাদের বলছি, তোমরা চাও, তোমাদের দেওয়া হবে, খোঁজ তোমরা পাবে। দরজায় ধাক্কা দাও, তোমাদের জন্য দরজা খোলা হবে। 10কারণ যারা চায়, তারা পায়। যারা খোঁজ করে, তারা সন্ধান পায় আর যারা দরজায় ধাক্কা দেয়, তাদের জন্য দরজা খোলা হয়। 11তোমাদের মধ্যে এমন বাবা কি কেউ আছে যার ছেলে মাছ চাইলে সে তাকে মাছের বদলে সাপ দেবে? 12অথবা ছেলে যদি ডিম চায় তবে তাকে কাঁকড়াবিছা দেবে? 13তাই তোমরা যদি মন্দ প্রকৃতির হয়েও তোমাদের ছেলেমেয়েদের ভাল ভাল জিনিস দিতে জান, তবে স্বর্গের পিতার কাছে যারা চায়, তিনি যে তাদের পবিত্র আত্মা দেবেন, এটা কত না নিশ্চয়।”

ঈশ্বরই যীশুর ক্ষমতার উৎস

(মথি 12:22-30; মার্ক 3:20-27)

14একসময় যীশু একজনের মধ্য থেকে একটা বোবা ভূতকে বার করে দিলেন। সেই ভূত বার হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ঐ লোকটি কথা বলতে শুরু করল। এই দেখে লোকেরা অবাক হয়ে গেল। 15কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, “ভূতদের রাজা বেলস্বূলের সাহায্যেই ও ভূত তাড়ায়!”

16আবার কেউ কেউ যীশুকে পরীক্ষা করবার জন্য আকাশ থেকে কোন চিহ্ন দেখাতে বলল। 17কিন্তু তিনি তাদের মনের কথা জানতে পেরে বললেন, “যে রাজ্য আত্মকলহে নিজেদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, সেই রাজ্য ধ্বংস হয়। আবার কোন পরিবার যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, তবে সেই পরিবারও ভেঙে যায়। 18তাই শয়তানও যদি নিজের বিরুদ্ধে নিজে দাঁড়ায় তবে কেমন করে তার রাজ্য টিকবে? আমি তোমাদের একথা জিজ্ঞেস করছি কারণ তোমরা বলছ আমি বেলস্বূলের সাহায্যে ভূত ছাড়াই। 19কিন্তু আমি যদি বেলস্বূলের সাহায্যে ভূত ছাড়াই, তবে তোমাদের অনুগামীরা কার সাহায্যে তা ছাড়ায়? তাই তারাই তোমাদের বিচার করুক। 20কিন্তু আমি যদি ঈশ্বরের শক্তিতে ভূতদের ছাড়াই, তাহলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে ঈশ্বরের রাজ্য তোমাদের কাছে ইতিমধ্যেই এসে পড়েছে।

21“যখন কোন শক্তিশালী লোক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তার ঘর পাহারা দেয়, তখন তার ধনসম্পদ নিরাপদে থাকে। 22কিন্তু তার থেকে পরাক্রান্ত কোন লোক যখন তাকে আক্রমণ করে পরাস্ত করে, তখন নিরাপদে থাকার জন্য যে অস্ত্রশস্ত্রের ওপর সে নির্ভর করেছিল, অন্য শক্তিশালী লোকটি সেগুলো কেড়ে নেয় আর ঐ লোকটির ঘরের সব জিনিসপত্র লুটে নেয়।

23“যে আমার পক্ষে নয়, সে আমার বিপক্ষ। যে আমার সঙ্গে কুড়ায়না, সে ছড়ায়়।

শূন্য ঘর

(মথি 12:43-45)

24“কোন অশুচি আত্মা যখন কোন লোকের মধ্য থেকে বাইরে আসে, তখন সে বিশ্রামের খোঁজে নির্জন স্থানে ঘোরাফেরা করে আর বিশ্রাম না পেয়ে বলে, ‘যে ঘর থেকে আমি বাইরে এসেছি, সেখানেই ফিরে যাব।’ 25কিন্তু সেখানে ফিরে গিয়ে সে যখন দেখে সেই ঘরটি পরিষ্কার করা হয়েছে আর সাজানো-গোছানো আছে, 26তখন সে গিয়ে তার থেকে আরো দুষ্ট সাতটা আত্মাকে নিয়ে এসে ঐ ঘরে বসবাস করতে থাকে। তাই ঐ লোকের প্রথম দশা থেকে শেষ দশা আরো ভয়ঙ্কর হয়।”

প্রকৃত সুখী লোক

27যীশু যখন এইসব কথা বলছিলেন, তখন সেই ভীড়ের মধ্য থেকে একজন স্ত্রীলোক চিৎকার করে বলে উঠল, “ধন্য সেই মা, যিনি আপনাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, আর যাঁর স্তন আপনি পান করেছিলেন।”

28কিন্তু যীশু বললেন, “এর থেকেও ধন্য তারা যারা ঈশ্বরের শিক্ষা শোনে ও তা পালন করে।”

চিহ্নের অন্বেষণ

(মথি 12:38-42; মার্ক 8:12)

29এরপর যখন ভীড় বাড়তে লাগল, তখন যীশু বললেন, “এ যুগের লোকেরা খুবই দুষ্ট, তারা কেবল অলৌকিক চিহ্নের খোঁজ করে। কিন্তু যোনার চিহ্ন ছাড়া তাদের আর কোন চিহ্ন দেখানো হবে না। 30যোনা যেমন নীনবীয় লোকদের কাছে চিহ্নস্বরূপ হয়েছিলেন, তেমনি এই যুগের লোকদের কাছে মানবপুত্র হবেন।

31“দক্ষিণ দেশের রাণী+ 11:31 দক্ষিণ … রাণী অথবা “শিবার রাণী।” তিনি ঈশ্বরের জ্ঞান অর্জনের জন্য সলোমন থেকে এক হাজার মাইল ভ্রমণ করেছিলেন। দ্রষ্টব্য 1 রাজাবলি 10:1-13. বিচার দিনে উঠে এই যুগের লোকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন ও তাদের দোষী সাব্যস্ত করবেন। কারণ শলোমনের জ্ঞানের কথা শোনার জন্য তিনি পৃথিবীর প্রান্ত থেকে এসেছিলেন, আর শলোমন এর থেকে মহান একজন এখন এখানে আছেন।

32“বিচার দিনে নীনবীয় লোকেরা এই যুগের লোকদের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবে, তারা এদের ওপর দোষারোপ করবে, কারণ তারা যোনার প্রচার শুনে অনুশোচনা করেছিল, আর এখন যোনার থেকে মহান একজন এখানে আছেন।

জগতের আলোস্বরূপ হও

(মথি 5:15; 6:22-23)

33“প্রদীপ জ্বেলে কেউ আড়ালে রাখে না বা ধামা চাপা দিয়ে রাখে না বরং তা বাতিদানের ওপরেই রাখে, যেন যারা ঘরে আসে, তারা আলো দেখতে পায়। 34তোমার চোখ যদি সুস্থ থাকে, তবে তোমার সমস্ত দেহটি দীপ্তিময় হবে; কিন্তু তা যদি মন্দ হয় তবে তোমার দেহ অন্ধকারময় হবে। 35তাই সাবধান, তোমার মধ্যে যে আলো আছে তা যেন অন্ধকার না হয়। 36তোমার সারা দেহ যদি আলোকময় হয়, তার মধ্যে যদি এতটুকু অন্ধকার না থাকে, তবে তা সম্পূর্ণ আলোকিত হবে, ঠিক যেমন বাতির আলো তোমার ওপর পড়ে তোমায় আলোকিত করে তোলে।”

যীশু ফরীশীদের সমালোচনা করলেন

(মথি 23:1-36; মার্ক 12:38-40; লূক 20:45-47)

37যীশু এই কথা শেষ করলে একজন ফরীশী তার বাড়িতে যীশুকে খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করল। তাই তিনি তার বাড়িতে গিয়ে খাবার আসনে বসলেন। 38কিন্তু সেই ফরীশী দেখল যে খাওয়ার আগে প্রথা মতো যীশু হাত ধুলেন না। 39প্রভু তাকে বললেন, “তোমরা ফরীশীরা থালা বাটির বাইরেটা পরিষ্কার কর, কিন্তু ভেতরে তোমরা দুষ্টতা ও লোভে ভরা। 40তোমরা মূর্খের দল! তোমরা কি জান না যিনি বাইরেটা করেছেন তিনি ভেতরটাও করেছেন? 41তাই তোমাদের থালা বাটির ভেতরে যা কিছু আছে তা দরিদ্রদের বিলিয়ে দাও, তাহলে সবকিছুই তোমাদের কাছে সম্পূর্ণ শুচি হয়ে যাবে।

42“কিন্তু হায়, ফরীশীরা ধিক্ তোমাদের কারণ তোমরা পুদিনা, ধনে ও বাগানের অন্যান্য শাকের দশমাংশ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে থাক, কিন্তু ন্যায়বিচার ও ঈশ্বরের প্রতি প্রেমের বিষয়টি অবহেলা কর। কিন্তু প্রথম বিষয়গুলির সঙ্গে সঙ্গে শেষেরগুলিও তোমাদের জীবনে পালন করা কর্তব্য।

43“ধিক্ ফরীশীরা! তোমরা সমাজ-গৃহে সম্মানিত আসন আর হাটে বাজারে সকলের সশ্রদ্ধ অভিবাদন পেতে কত না ভালবাস। 44ধিক্ তোমাদের! তোমরা মাঠের মাঝে মিশে থাকা কবরের মতো, লোকেরা না জেনে যার ওপর দিয়ে হেঁটে যায়।”

45একজন ব্যবস্থার শিক্ষক এর উত্তরে যীশুকে বললেন, “গুরু, আপনি এসব যা বললেন, তার দ্বারা আমাদেরও অপমান করলেন।”

46তখন যীশু তাকে বললেন, “হে ব্যবস্থার শিক্ষকরা, ধিক্ তোমাদের, তোমরা লোকদের ওপর এমন ভারী বোঝা চাপিয়ে দাও যা তাদের পক্ষে গ্রহণ করা অসম্ভব; আর তোমরা নিজেরা সেই ভার বইবার জন্য সাহায্য করতে তাতে একটা আঙুল পর্যন্ত ছোঁয়াও না। 47ধিক্ তোমাদের, কারণ তোমরা ভাববাদীদের সমাধিগুহা গেঁথে থাকো; আর এইসব ভাববাদীদের তোমাদের পূর্বপুরুষরাই হত্যা করেছিল। 48তাই এই কাজ করে তোমরা এই সাক্ষ্যই দিচ্ছ যে তোমাদের পূর্বপুরুষরা যে কাজ করেছিল তা তোমরা ঠিক বলে মেনে নিচ্ছ। কারণ তারা ওদের হত্যা করেছিল আর তোমরা ওদের সমাধি গুহা রচনা করছ। 49এই কারণেই ঈশ্বরের প্রজ্ঞা বলছে, ‘আমি তাদের কাছে যে ভাববাদী ও প্রেরিতদের পাঠাবো, তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে তারা হত্যা করবে, কাউকে বা নির্যাতন করবে।’

50“সেই জন্যই জগৎ‌ সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত ভাববাদী হত্যা করা হয়েছে, তাদের সকলের হত্যার জন্য এই কালের লোকদের শাস্তি পেতে হবে। 51হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, হেবলের রক্তপাত থেকে আরম্ভ করে যে সখরিয়কে যজ্ঞবেদী ও মন্দিরের মধ্যবর্তী স্থানে হত্যা করা হয়েছিল, সেই সখরিয়ের হত্যা পর্যন্ত সমস্ত রক্তপাতের দায়ে দায়ী হবে একালের লোকেরা।

52“ধিক্ ব্যবস্থার শিক্ষকরা কারণ তোমরা জ্ঞানের চাবিটি ধরে আছ। তোমরা নিজেরাও প্রবেশ করনি আর যারা প্রবেশ করার চেষ্টা করছে তাদেরও বাধা দিচ্ছ।”

53তিনি যখন সেই জায়গা ছেড়ে চলে গেলেন, তখন ব্যবস্থার শিক্ষকরা ও ফরীশীরা তাঁর বিরুদ্ধে ভীষণভাবে শত্রুতা করতে আরম্ভ করল এবং পরে তাঁকে নানাভাবে প্রশ্ন করতে থাকল। 54তারা সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল যেন যীশু ভুল কিছু করলে তাই দিয়ে তাঁকে ধরতে পারে।

12

ফরীশীদের মতো হয়ো না

1এর মধ্যে হাজার হাজার লোক এসে জড়ো হল। প্রচণ্ড ভীড়ের চাপে ধাক্কা-ধাক্কি করে একে অপরের উপর পড়তে লাগল। তখন তিনি প্রথমে তাঁর শিষ্যদের বললেন, “ফরীশীদের খামির থেকে সাবধান থেকো। 2এমন কিছুই লুকানো নেই যা প্রকাশ পাবে না, আর এমন কিছুই গুপ্ত নেই যা জানা যাবে না। 3তাই তোমরা অন্ধকারে যা বলছ তা আলোতে শোনা যাবে। তোমরা গোপন কক্ষে ফিস্-ফিস্ করে কানে কানে যা বলবে তা বাড়ির ছাদের ওপর থেকে ঘোষণা করা হবে।”

কেবল ঈশ্বরকে ভয় কর

(মথি 10:28-31)

4কিন্তু হে আমার বন্ধুরা, “আমি তোমাদের বলছি, যারা তোমাদের দেহটাকে ধ্বংস করে দিতে পারে, কিন্তু এর বেশী কিছু করতে পারে না তাদের তোমরা ভয় করো না। 5তবে কাকে ভয় করবে তা আমি তোমাদের বলে দিচ্ছি। তোমাদের মেরে ফেলার পর নরকে পাঠাবার ক্ষমতা যাঁর আছে, তাঁকেই ভয় কর। হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, তাঁকেই ভয় করো।

6“পাঁচটা চড়াই পাখি কি মাত্র কয়েক পয়সায় বিক্রি হয় না? তবু ঈশ্বর তার একটাকেও ভুলে যান না। 7এমন কি তোমাদের মাথার প্রতিটি চুল গোনা আছে। ভয় নেই, বহু চড়াই পাখির চেয়ে তোমাদের মূল্য অনেক বেশী।

যীশুর জন্যে লজ্জা পেও না

(মথি 10:32-33; 12:32; 10:19-20)

8“কিন্তু আমি তোমাদের বলছি, যে কেউ অন্য লোকদের সামনে আমাকে স্বীকার করে, মানবপুত্রও ঈশ্বরের স্বর্গদূতদের সামনে তাকে স্বীকার করবেন। 9কিন্তু যে কেউ সর্বসাধারণের সামনে আমায় অস্বীকার করবে, ঈশ্বরের স্বর্গদূতদের সামনে তাদের অস্বীকার করা হবে।

10“মানবপুত্রের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বললে তাকে ক্ষমা করা হবে; কিন্তু কেউ পবিত্র আত্মার নামে নিন্দা করলে তাকে ক্ষমা করা হবে না।

11“তারা তখন তোমাদের সমাজ-গৃহের সমাবেশে শাসনকর্তাদের বা কর্ত্তৃত্ব সম্পন্ন ব্যক্তিদের সামনে হাজির করবে, তখন কিভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করবে বা কি বলবে তা নিয়ে চিন্তা করো না। 12কারণ সেই সময় কি বলতে হবে তা পবিত্র আত্মা তোমাদের সেইক্ষণেই শিখিয়ে দেবেন।”

স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে যীশুর সতর্কবাণী

13এরপর সেই ভীড়ের মধ্য থেকে একজন লোক যীশুকে বলল, “গুরু, উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের যে সম্পত্তি রয়েছে তা আমার ভাইকে আমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে বলুন।”

14কিন্তু যীশু তাকে বললেন, “বিচারকর্তা হিসাবে কে তোমাদের ওপর আমায় নিয়োগ করেছে?” 15এরপর যীশু লোকদের বললেন, “সাবধান! সমস্ত রকম লোক থেকে নিজেদের দূরে রাখ, কারণ মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পত্তি থাকলেও তার জীবন তার সম্পত্তির ওপর নির্ভর করে না।”

16তখন তিনি তাদের একটি দৃষ্টান্ত দিলেন: “একজন ধনবান লোকের জমিতে প্রচুর ফসল হয়েছিল। 17এই দেখে সে মনে মনে বলল, ‘আমি কি করব? এতো ফসল রাখার জায়গা তো আমার নেই।’

18“এরপর সে বলল, ‘আমি এই রকম করব; আমার যে গোলাঘরগুলো আছে তা ভেঙে ফেলে তার থেকে বড় গোলাঘর বানাবো; আর সেখানেই আমার সমস্ত ফসল ও জিনিস মজুত করব। 19আর আমার প্রাণকে বলব, হে প্রাণ, অনেক বছরের জন্য অনেক ভাল ভাল জিনিস তোমার জন্য সঞ্চয় করা হয়েছে। এখন আরাম করে খাও-দাও, স্ফূর্তি কর!’

20“কিন্তু ঈশ্বর তাকে বললেন, ‘ওরে মূর্খ! আজ রাতেই তোমার প্রাণ কেড়ে নেওয়া হবে; আর তুমি যা কিছু আয়োজন করেছ তা কে ভোগ করবে?’

21“যে লোক নিজের জন্য ধন সঞ্চয় করে কিন্তু ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ধনবান নয়, তার এইরকম হয়।”

ঈশ্বরের রাজ্যের প্রথম স্থান

(মথি 6:25-34, 19-21)

22এরপর যীশু তাঁর অনুগামীদের বললেন, “তাই আমি তোমাদের বলছি, কি খাব বলে প্রাণের বিষয়ে বা কি পরব বলে শরীরের বিষয়ে চিন্তা করো না। 23কারণ খাদ্যবস্তু থেকে প্রাণ অনেক মূল্যবান এবং পোশাক-আশাকের থেকে দেহের গুরুত্ব অনেক বেশী। 24কাকদের বিষয় চিন্তা কর, তারা বীজও বোনে না বা ফসলও কাটে না। তাদের কোন গুদাম বা গোলাঘর নেই, তবু ঈশ্বরই তাদের আহার যোগান। এইসব পাখিদের থেকে তোমরা কত অধিক মূল্যবান! 25তোমাদের মধ্যে কে দুশ্চিন্তা করে নিজের আয়ু এক ঘন্টা বাড়াতে পারে? 26এই সামান্য কাজটাই যদি করতে না পার তবে বাকী সব বিষয়ের জন্য এত চিন্তা কর কেন?

27“ছোট্ট ছোট্ট লিলি ফুলের কথা চিন্তা কর দেখি, তারা কিভাবে বেড়ে ওঠে। তারা পরিশ্রমও করে না, সুতাও কাটেনা। তবু আমি তোমাদের বলছি, এমন কি রাজা শলোমন তাঁর সমস্ত প্রতাপ ও গৌরবে মণ্ডিত হয়েও এদের একটার মতোও নিজেকে সাজাতে পারেন নি। 28মাঠে যে ঘাস আজ আছে আর কাল উনুনে ফেলে দেওয়া হবে, ঈশ্বর তা যদি এত সুন্দর করে সাজান, তবে হে অল্প বিশ্বাসীর দল, তিনি তোমাদের আরো কত না বেশী সাজাবেন!

29“আর কি খাবে বা কি পান করবে এ নিয়ে তোমরা চিন্তা করো না, এর জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন দরকার নেই। 30এই পৃথিবীর আর সব জাতির লোকেরা যাঁরা ঈশ্বরকে জানে না, তারাই এই সবের পিছনে ছোটে। কিন্তু তোমাদের পিতা ঈশ্বর জানেন যে এসব জিনিস তোমাদের প্রয়োজন আছে। 31তার চেয়ে বরং তোমরা ঈশ্বরের রাজ্যের বিষয়ে সচেষ্ট হও তাহলে এসবই ঈশ্বর তোমাদের জোগাবেন।

অর্থকে বিশ্বাস করো না

32“ক্ষুদ্র মেষপাল! তোমরা ভয় পেও না, কারণ তোমাদের পিতা আনন্দের সাথেই সেই রাজ্য তোমাদের দেবেন, এটাই তাঁর ইচ্ছা। 33তোমাদের সম্পদ বিক্রি করে অভাবীদের দাও। নিজেদের জন্য এমন টাকার থলি তৈরী কর যা পুরানো হয় না, স্বর্গে এমন ধনসঞ্চয় কর যা শেষ হয় না, সেখানে চোর ঢুকতে পারে না বা মথ কাটে না। 34কারণ যেখানে তোমাদের সম্পদ সেখানেই তোমাদের মনও পড়ে থাকবে।

সর্বদাই প্রস্তত থাক

(মথি 24:42-44)

35“তোমরা কোমর বেঁধে বাতি জ্জ্বালিয়ে নিয়ে প্রস্তুত থাক। 36তোমরা এমন লোকদের মতো হও যারা তাদের মনিব বিয়ে বাড়ি থেকে কখন ফিরে আসবে তারই অপেক্ষায় থাকে; যেন তিনি ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়লেই তখনই তাঁর জন্য দরজা খুলে দিতে পারে। 37ধন্য সেই সব দাস, মনিব এসে যাদের জেগে প্রস্তুত থাকতে দেখবেন। আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তিনি নিজে পোশাক বদলে প্রস্তুত হয়ে তাদের খেতে বসাবেন, এবং নিজেই পরিবেশন করবেন। 38তিনি রাতের দ্বিতীয় প্রহরে ও তৃতীয় প্রহরে এসে যদি তাদের প্রস্তুত থাকতে দেখেন তাহলে ধন্য তারা।

39“কিন্তু একথা জেনে রেখো, চোর কোন সময় আসবে তা যদি বাড়ির কর্তা জানতে পারে তাহলে সে তার বাড়িতে সিঁদ কাটতে দেবে না। 40তাই তোমরাও প্রস্তুত থেকো, কারণ তোমরা যে সময় আশা করবে না, মানবপুত্র সেই সময় আসবেন।”

বিশ্বস্ত দাস কে?

(মথি 24:45-51)

41তখন পিতর বললেন, “প্রভু এই দৃষ্টান্তটি কি আপনি শুধু আমাদের জন্য বললেন, না এটা সকলের জন্য?”

42তখন প্রভু বললেন, “সেই বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ কর্মচারী কে, যাকে তার মনিব তাঁর অন্য কর্মচারীদের সময়মতো খাবার ভাগ করে দেবার ভার দেবেন? 43ধন্য সেই দাস, যাকে তার মনিব এসে বিশ্বস্তভাবে কাজ করতে দেখবেন। 44আমি তোমাদের সত্যি বলছি, মনিব সেই কর্মচারীর ওপর তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দেখাশোনার ভার দেবেন।

45“কিন্তু সেই কর্মচারী যদি মনে মনে বলে, আমার মনিবের আসতে এখন অনেক দেরী আছে। এই মনে করে সে যদি তার অন্য দাস-দাসীদের মারধর করে আর পানাহারে মত্ত হয়, 46তাহলে যে দিন ও যে সময়ের কথা সে একটুকু চিন্তাও করবে না, সেই দিন ও সেই সময়েই তার মনিব এসে হাজির হবেন। তার মনিব তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবেন; আর অবিশ্বাসীদের জন্য যে জায়গা ঠিক করা হয়েছে, তার স্থান সেখানেই হবে।

47“যে দাস তার মনিবের ইচ্ছা জেনেও প্রস্তুত থাকে নি, অথবা যে তার মনিবের ইচ্ছানুসারে কাজ করে নি, সেই দাস কঠোর শাস্তি পাবে। 48কিন্তু যে তার মনিব কি চায় তা জানে না, এই না জানার দরুন এমন কাজ করে ফেলেছে যার জন্য তার শাস্তি হওয়া উচিৎ, সেই দাসের কম শাস্তি হবে। যাকে বেশী দেওয়া হয়েছে, তার কাছ থেকে বেশী পাবার আশা করা হবে। যার ওপর বেশী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, লোকেরা তার কাছ থেকে অধিক চাইবে।”

যীশুর বিষয়ে লোকেরা একমত হবে না

(মথি 10:34-36)

49“আমি পৃথিবীতে আগুন নিক্ষেপ করতে এসেছি, আহা, যদি তা আগেই জ্বলে উঠত! 50এক বাপ্তিস্মে আমায় বাপ্তাইজিত হতে হবে, আর যতক্ষণ না তা হচ্ছে, আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি। 51তোমরা কি মনে কর এই পৃথিবীতে আমি শান্তি স্থাপন করতে এসেছি? না, আমি তোমাদের বলছি, বরং বিভেদ ঘটাতে এসেছি। 52কারণ এখন থেকে একই পরিবারে পাঁচজন থাকলে তারা পরস্পরের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। তিনজন দুজনের বিরুদ্ধে যাবে, আর দুজন তিনজনের বিরুদ্ধে যাবে।

53বাবা ছেলের বিরুদ্ধে

ও ছেলে বাবার বিরুদ্ধে যাবে।

মা মেয়ের বিরুদ্ধে

ও মেয়ে মায়ের বিরুদ্ধে যাবে।

শাশুড়ী বৌমার বিরুদ্ধে

ও বৌমা শাশুড়ীর বিরুদ্ধে যাবে।”

সময়কে বুঝতে হবে

(মথি 16:2-3)

54এরপর যীশু সমবেত জনতার দিকে ফিরে বললেন, “পশ্চিমদিকে মেঘ জমতে দেখে তোমরা বলে থাকো, ‘বৃষ্টি আসলো বলে, আর তা-ই হয়।’ 55যখন দক্ষিণা বাতাস বয়, তোমরা বলে থাক, ‘গরম পড়বে,’ আর তা-ই হয়। 56ভণ্ডের দল! তোমরা পৃথিবী ও আকাশের চেহারা দেখে তার অর্থ বুঝতে পার; কিন্তু এ কেমন যে তোমরা বর্তমান সময়ের অর্থ বুঝতে পার না?

সমস্যার সমাধান কর

(মথি 5:25-26)

57“যা কিছু ন্যায্য, নিজেরাই কেন তার বিচার কর না? 58তোমাদের প্রতিপক্ষের সঙ্গে তোমরা যখন বিচারকের কাছে যাও, তখন পথেই তা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর। নতুবা সে হয়তো তোমাকে বিচারকের কাছে টেনে নিয়ে যাবে, বিচারক তোমাকে সেপাইয়ের হাতে দেবে আর সেপাই তোমায় কারাগারে দেবে। 59আমি তোমাকে বলছি, শেষ পয়সাটি না দেওয়া পর্যন্ত তুমি কোন মতেই কারাগার থেকে ছাড়া পাবে না।”

13

মন-ফিরাও

1সেই সময় কয়েকজন লোক যীশুকে সেই সব গালীলীয়দের বিষয় বলল, যাদের রক্ত রাজ্যপাল পীলাত তাদের উৎসর্গ করা বলির রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। 2যীশু এর উত্তরে বললেন, “তোমরা কি মনে কর এই গালীলীয়রা কষ্টভোগ করেছিল বলে অন্যান্য সব গালীলীয়দের থেকে বেশী পাপী ছিল? 3না, আমি তোমাদের বলছি, তোমরা যদি পাপ থেকে মন না ফিরাও, তাহলে তোমরাও তাদের মত মরবে। 4শীলোহ চূড়ো ভেঙ্গে পড়ে যে আঠারো জনের মৃত্যু হয়েছিল, তাদের বিষয়ে তোমাদের কি মনে হয়? তোমরা কি মনে কর জেরুশালেমের বাকী সব লোকদের থেকে তারা বেশী দোষে দোষী ছিল? 5না, আমি তোমাদের বলছি, তোমরা যদি পাপ থেকে মন না ফিরাও, তাহলে তোমরাও তাদের মতো মরবে।”

অপ্রয়োজনীয় গাছ

6এরপর যীশু তাদের এই দৃষ্টান্তটি বললেন, “একজন লোক তার বাগানে একটি ডুমুর গাছ পুঁতেছিল। পরে সে এসে সেই গাছে ফল হয়েছে কি না খোঁজ করল, কিন্তু কোন ফল দেখতে পেল না। 7তখন সে বাগানের মালীকে বলল, ‘দেখ, আজ তিন বছর ধরে এই ডুমুর গাছে ফলের খোঁজে আমি আসছি, কিন্তু আমি এতে কোন ফলই দেখতে পাচ্ছি না, তাই তুমি এই গাছটা কেটে ফেল, এটা অযথা জমি নষ্ট করবে কেন?’ 8মালী তখন বলল, ‘প্রভু, এ বছরটা দেখতে দিন। আমি এর চারপাশে খুঁড়ে সার দিই। 9সামনের বছর যদি এতে ফল আসে তো ভালোই! তা না হলে আপনি ওটাকে কেটে ফেলবেন।’”

বিশ্রামবারে এক স্ত্রীলোকের আরোগ্যলাভ

10কোন এক বিশ্রামবারে যীশু এক সমাজগৃহে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। 11সেখানে একজন স্ত্রীলোক ছিল যাকে এক দুষ্ট আত্মা আঠারো বছর ধরে পঙ্গু করে রেখেছিল। সে কুঁজো হয়ে গিয়েছিল, কোনরকমেই সোজা হতে পারত না। 12যীশু তাকে দেখে কাছে ডাকলেন, এবং স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “হে নারী, তোমার রোগ থেকে তুমি মুক্ত হলে!” 13এরপর তিনি তার ওপর হাত রাখলেন, সঙ্গে সঙ্গে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল, আর ঈশ্বরের প্রশংসা করতে লাগল।

14যীশু তাকে বিশ্রামবারে সুস্থ করলেন বলে সেই সমাজগৃহের নেতা খুবই রেগে গিয়ে লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, “সপ্তাহে দুদিন তো কাজ করার জন্য আছে, তাই ঐ সব দিনে এসে সুস্থ হও, বিশ্রামবারে এসো না।”

15প্রভু এর উত্তরে তাঁকে বললেন, “ভণ্ডের দল! তোমরা কি বিশ্রামবারে গরু বা গাধা খোঁযাড় থেকে বার করে জল খাওয়াতে নিয়ে যাও না? 16এই স্ত্রীলোকটি, যে অব্রাহামের বংশে জন্মেছে, যাকে শয়তান আঠারো বছর ধরে বেঁধে রেখেছিল, বিশ্রামবার বলে কি সে সেই বাঁধন থেকে মুক্ত হবে না?” 17তিনি এই কথা বলাতে যারা তাঁর বিরুদ্ধে ছিল তারা সকলেই খুব লজ্জা পেল; আর তিনি যে অপূর্ব কাজ করেছেন তার জন্য সমবেত জনতা আনন্দ করতে লাগল।

ঈশ্বরের রাজ্য

(মথি 13:31-33; মার্ক 4:30-32)

18এরপর যীশু বললেন, “ঈশ্বরের রাজ্য কেমন, আমি কিসের সঙ্গে এর তুলনা করব? 19এ হল একটা ছোট্ট সরষে বীজের মতো, যা একজন লোক নিয়ে তার বাগানে পুঁতল, আর তা থেকে অঙ্কুর বেরিয়ে সেটা বাড়তে লাগল, পরে সেটা একটা গাছে পরিণত হলে তার ডালপালাতে আকাশের পাখিরা এসে বাসা বাঁধল।”

20তিনি আরও বললেন, “ঈশ্বরের রাজ্যকে আমি কিসের সঙ্গে তুলনা করব? 21এ হল খামিরের মতো, যা কোন একজন স্ত্রীলোক একতাল ময়দার সঙ্গে মেশাল, পরে সেই খামিরে সমস্ত তালটা ফুলে উঠল।”

অপ্রশস্ত দরজা

(মথি 7:13-14, 21-23)

22যীশু বিভিন্ন নগর ও গ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে শিক্ষা দিচ্ছিলেন, এইভাবে তিনি জেরুশালেমের দিকে এগিয়ে চললেন। 23কোন একজন লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “প্রভু উদ্ধার কি কেবল অল্প কয়েকজন লোকই পাবে?”

তিনি তাদের বললেন, 24“সরু দরজা দিয়ে ঢোকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা কর, কারণ আমি তোমাদের বলছি, অনেকেই ঢোকার চেষ্টা করবে; কিন্তু ঢুকতে পারবে না। 25ঘরের কর্তা উঠে যখন দরজা বন্ধ করবেন, তখন তোমরা বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় ঘা দিতে দিতে বলবে, ‘প্রভু আমাদের জন্য দরজা খুলে দিন।’ কিন্তু তিনি তোমাদের বলবেন, ‘তোমরা কোথা থেকে এসেছ; আমি জানি না।’ 26তারপর তোমরা বলতে থাকবে, ‘আমরা আপনার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করেছি; আর আপনি তো আমাদের পথে পথে উপদেশ দিয়েছেন।’ 27তখন তিনি তোমাদের বলবেন, ‘তোমরা কোথা থেকে এসেছ, আমি জানি না। তোমরা সব দুষ্টের দল, আমার কাছ থেকে দূর হও।’

28“তোমরা যখন দেখবে যে অব্রাহাম, ইস‌্হাক, যাকোব ও সব ভাববাদীরা ঈশ্বরের রাজ্যে আছেন কিন্তু তোমাদের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তখন কান্নাকাটি করবে ও দাঁতে দাঁত ঘসতে থাকবে; 29আর লোকেরা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম থেকে এসে ঈশ্বরের রাজ্যে নিজের নিজের আসন গ্রহণ করবে। 30মনে রেখো, যারা আজ শেষে রয়েছে, তারা প্রথমে স্থান নেবে, আর যারা আজ প্রথমে রয়েছে, তারা শেষের হবে।”

জেরুশালেমে যীশুর মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী

(মথি 23:37-39)

31সেই সময় কয়েকজন ফরীশী যীশুর কাছে এসে বললেন, “তুমি এখান থেকে অন্য কোথাও যাও! কারণ হেরোদ তোমায় হত্যা করতে চাইছে।”

32যীশু তাদের বললেন, “তোমরা গিয়ে সেই শিয়ালটাকে+ 13:32 শিয়াল শিয়াল একটি ধূর্ত প্রাণী। এখানে যীশু হেরোদকে শিয়ালের সঙ্গে তুলনা করে তাকে শিয়ালের মতো ধূর্ত বলতে চাইছেন। বল, ‘আমি আজ ও কাল ভূত ছাড়াবো ও রোগীদের সুস্থ করব, আর তৃতীয় দিনে আমি আমার কাজ শেষ করব।’ 33আমি আমার পথে চলতেই থাকব, কারণ জেরুশালেমের বাইরে কোন ভাববাদী প্রাণ হারাবে তেমনটি হতে পারে না।

34“জেরুশালেম, হায় জেরুশালেম! তুমি ভাববাদীদের হত্যা করেছ; আর ঈশ্বর তোমার কাছে যাদের পাঠিয়েছেন তুমি তাদের পাথর মেরেছ! মুরগী যেমন তার বাচ্চাদের নিজের ডানার নীচে জড়ো করে, তেমনি আমি কতবার তোমার লোকদের আমার কাছে জড়ো করতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি রাজী হও নি। 35এইজন্য দেখ তোমাদের গৃহ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। আমি তোমাদের বলছি, যতদিন না তোমরা বলবে, ‘ধন্য তিনি, যিনি প্রভুর নামে আসছেন, ততদিন তোমরা আমায় আর দেখতে পাবে না।’”+ 13:35 উদ্ধৃতি গীত 118:26.

14

বিশ্রামবারে আরোগ্যদান করা কি উচিত?

1এক বিশ্রামবারে যীশু ফরীশীদের একজন নেতৃস্থানীয় লোকের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে গেলেন। সেখানে সমবেত লোকেরা যীশুর প্রতি লক্ষ্য রাখছিল। 2যীশুর সামনে একটি লোক ছিল যে উদরী রোগে ভুগছিল। 3যীশু তখন ব্যবস্থার শিক্ষক ও ফরীশীদের লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, “বিশ্রামবারে কাউকে সুস্থ করা কি বিধিসম্মত?” 4কিন্তু তারা সকলে চুপ করে রইল। তখন যীশু সেই অসুস্থ লোকটিকে ধরে তাকে সুস্থ করলেন, পরে বিদায় নিলেন। 5এরপর তিনি তাদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে কারোর সন্তান বা গরু যদি বিশ্রামবারে কুয়োয় পড়ে যায় তাহলে তোমরা কি সঙ্গে সঙ্গে তাকে সেখান থেকে টেনে তুলবে না?” 6তারা কেউ এই কথার জবাব দিতে পারল না।

নিজেকে বড় করে তুলো না

7যীশু দেখলেন নিমন্ত্রিত অতিথিরা কিভাবে নিজেরাই ভোজের শ্রেষ্ঠ আসন দখল করার চেষ্টা করছে। তাই তিনি তাদের কাছে এই দৃষ্টান্তটি নিয়ে বললেন, 8“বিয়ের ভোজে যখন কেউ তোমাদের নিমন্ত্রণ করে তখন সেখানে গিয়ে সম্মানের আসনটা দখল করে বসবে না। কারণ তোমার চেয়ে হয়তো আরো সম্মানিত কাউকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। 9তা করলে যিনি তোমাদের উভয়কেই নিমন্ত্রণ করেছেন, তিনি এসে তোমায় বলবেন, ‘এঁকে তোমার জায়গাটা ছেড়ে দাও!’ তখন তুমি লজ্জায় পড়বে, কারণ তোমাকে সবচেয়ে নীচু জায়গায় বসতে হবে।

10“কিন্তু তুমি যখন নিমন্ত্রিত হয়ে যাও, সেখানে গিয়ে সবচেয়ে নীচু জায়গায় বসবে। যিনি তোমায় নিমন্ত্রণ করেছেন তিনি এসে এরকম দেখে তোমায় বলবেন, ‘বন্ধু এস, এই ভাল আসনে বস।’ তখন নিমন্ত্রিত অন্য সব অতিথিদের সামনে তোমার সম্মান হবে। 11যে কেউ নিজেকে সম্মান দিতে চায় তাকে নত করা হবে, আর যে নিজেকে নত করে তাকে সম্মানিত করা হবে।”

কি করলে তুমি পুরস্কৃত হবে

12তখন যে তাঁকে নিমন্ত্রণ করেছিল, তাকে যীশু বললেন, “তুমি যখন ভোজের আয়োজন করবে তখন তোমার বন্ধু, ভাই, আত্মীয়স্বজন বা ধনী প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করো না, কারণ তারা তোমাকে পাল্টা নিমন্ত্রণ করে প্রতিদান দেবে। 13কিন্তু তুমি যখন ভোজের আয়োজন করবে তখন দরিদ্র, খোঁড়া, বিকলাঙ্গ ও অন্ধদের নিমন্ত্রণ করো। 14তাতে যাদের প্রতিদান দেবার ক্ষমতা নেই, সেই রকম লোকদের নিমন্ত্রণ করার জন্য ধার্মিকদের পুনরুত্থানের সময় ঈশ্বর তোমায় পুরস্কার দেবেন।”

এক বিরাট ভোজের কাহিনী

(মথি 22:1-10)

15যারা খেতে বসেছিল তাদের মধ্যে একজন এই কথা শুনে যীশুকে বলল, “ঈশ্বরের রাজ্যে যারা খেতে বসবে তারা সকলে ধন্য।”

16তখন যীশু তাকে বললেন, “একজন লোক এক বিরাট ভোজের আয়োজন করেছিল আর সে অনেক লোককে নিমন্ত্রণ করেছিল। 17ভোজ খাওয়ার সময় হলে সে তার দাসকে দিয়ে নিমন্ত্রিত লোকদের বলে পাঠাল, ‘তোমরা এস! কারণ এখন সবকিছু প্রস্তুত হয়েছে!’ 18তারা সকলেই নানা অজুহাত দেখাতে শুরু করল। প্রথম জন তাকে বলল, ‘আমায় মাপ কর, কারণ আমি একটা ক্ষেত কিনেছি, তা এখন আমায় দেখতে যেতে হবে।’ 19আর একজন বলল, ‘আমি পাঁচ জোড়া বলদ কিনেছি, এখন সেগুলি একটু পরখ করে নিতে চাই, তাই আমি যেতে পারব না; আমায় মাপ কর।’ 20এরপর আর একজন বলল, ‘আমি সবে মাত্র বিয়ে করেছি, সেই কারণে আমি আসতে পারব না।’

21“সেই দাস ফিরে গিয়ে তার মনিবকে একথা জানালে, তার মনিব রেগে গিয়ে তার দাসকে বলল, ‘যাও, শহরের পথে পথে, অলিতে গলিতে গিয়ে গরীব, খোঁড়া, পঙ্গু ও অন্ধদের ডেকে নিয়ে এস।’

22“এরপর সেই দাস মনিবকে বলল, ‘প্রভু, আপনি যা যা বলেছেন তা করেছি, তা সত্ত্বেও এখনও অনেক জায়গা আছে।’ 23তখন মনিব সেই দাসকে বলল, ‘এবার তুমি গ্রামের পথে পথে, বেড়ার ধারে ধারে যাও, যাকে পাও তাকেই এখানে আসবার জন্য জোর কর, যেন আমার বাড়ি ভরে যায়। 24আমি তোমাদের বলছি, যাদের প্রথমে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল, তাদের কেউই আমার এই ভোজের স্বাদ পাবে না!’”

প্রথমে পরিকল্পনা কর

(মথি 10:37-38)

25যীশুর সঙ্গে সঙ্গে এক বিরাট জনতা চলেছিল, তাদের দিকে ফিরে যীশু বললেন, 26“যদি কেউ আমার কাছে আসে অথচ তার বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, এমন কি নিজের প্রাণকেও আমার চেয়ে বেশী ভালবাসে সে আমার শিষ্য হতে পারবে না। 27যে কেউ নিজের ক্রুশ কাঁধে তুলে নিয়ে আমায় অনুসরণ না করে, সে আমার শিষ্য হতে পারে না।

28“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি উঁচু একটি ঘর তুলতে চায়, তবে সে কি প্রথমে তা নির্মাণ করতে কত খরচ পড়বে তার হিসাব করে দেখবে না, যে তা শেষ করার মতো যথেষ্ট অর্থ তার আছে কি না? 29তা না হলে সে ভিত গাঁথবার পর যদি তা শেষ করতে না পারে, তবে যারা সেটা দেখবে তারা সবাই তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে, আর বলবে, 30এই লোকটা গাঁথতে শুরু করেছিল ঠিকই কিন্তু শেষ করতে পারল না।

31“যদি একজন রাজা আর একজন রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যায়, তবে সে প্রথমে বসে চিন্তা করবে না যে তার মাত্র দশ হাজার সৈন্য বিপক্ষের বিশ হাজার সৈন্যের মোকাবিলা করতে পারবে কিনা? 32যদি তা না পারে তবে তার শত্রু পক্ষ দূরে থাকতেই সে তার প্রতিনিধি পাঠিয়ে সন্ধির প্রস্তাব দেবে।

33“ঠিক সেই রকম ভাবে তোমাদের মধ্যে যে কেউ তার সর্বস্ব ত্যাগ না করে, সে আমার শিষ্য হতে পারে না।”

তোমার প্রভাব যেন নষ্ট না হয়

(মথি 5:13; মার্ক 9:50)

34“লবণ ভাল, তবে লবণের নোনতা স্বাদ যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তা কি আবার নোনতা করা যায়? 35তখন তা না জমির জন্য, না সারের গাদার জন্য উপযুক্ত থাকে, লোকে তা বাইরেই ফেলে দেয়।

“যার শোনার মতো কান আছে সে শুনুক।”

15

স্বর্গে আনন্দ

(মথি 18:12-14)

1অনেক করআদায়কারী ও পাপী লোকেরা প্রায়ই যীশুর কথা শোনার জন্য আসত। 2এতে ফরীশী ও ব্যবস্থার শিক্ষকরা এই বলে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে লাগল, “এই লোকটা জঘন্য পাপী লোকদের সঙ্গে মেলামেশা ও খাওয়া দাওয়া করে।”

3তখন যীশু তাদের কাছে এই দৃষ্টান্ত দিলেন, 4“যদি তোমাদের মধ্যে কারোর একশোটি ভেড়া থাকে, তার মধ্যে থেকে একটা হারিয়ে যায়, তবে সে কি মাঠের মধ্যে বাকি নিরানব্বইটা রেখে যেটা হারিয়ে গেছে তাকে না পাওয়া পর্যন্ত তার খোঁজ করবে না? 5আর যখন সে ঐ ভেড়াটাকে খুঁজে পায়, তখন তাকে আনন্দের সঙ্গে কাঁধে তুলে নেয়। 6তারপর বাড়ি এসে তার বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের ডেকে বলে, ‘এস, আমার সঙ্গে তোমরাও আনন্দ কর, কারণ আমার যে ভেড়াটা হারিয়ে গিয়েছিল তাকে আমি খুঁজে পেয়েছি।’ 7আমি তোমাদের বলছি, ঠিক সেইভাবে নিরানব্বই জন ধার্মিক, যাদের মন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই তাদের থেকে একজন পাপী যদি ঈশ্বরের কাছে মন ফিরায়, তাকে নিয়ে স্বর্গে মহানন্দ হয়।

8“ধর, কোন একজন স্ত্রীলোকের দশটা রূপোর সিকির একটা হার ছিল। তার মধ্য থেকে সে যদি একটা হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে কি প্রদীপ জ্বেলে সেই সিকিটি না পাওয়া পর্যন্ত ঘরের প্রতিটি জায়গা ভাল করে ঝাঁট দিয়ে খুঁজে দেখবে না? 9আর সে তা খুঁজে পেলে তার বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের ডেকে বলবে, ‘এস, আমার সঙ্গে আনন্দ কর, কারণ আমার যে সিকিটি হারিয়ে গিয়েছিল তা আমি খুঁজে পেয়েছি।’ 10আমি তোমাদের বলছি, ঠিক এইভাবে একজন পাপী যখন মন-ফিরায়, তখন ঈশ্বরের স্বর্গদূতদের সামনে আনন্দ হয়।”

গৃহত্যাগী ছেলে

11এরপর যীশু বললেন, “একজন লোকের দুটি ছেলে ছিল। 12ছোট ছেলেটি তার বাবাকে বলল, ‘বাবা, সম্পত্তির যে অংশ আমার ভাগে পড়বে তা আমায় দিয়ে দাও।’ তখন বাবা দুই ছেলের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিলেন।

13“কিছু দিন পর ছোট ছেলে তার সমস্ত কিছু নিয়ে দূর দেশে চলে গেল। সেখানে সে উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করে সমস্ত টাকা পয়সা উড়িয়ে দিল। 14তার সব টাকা পয়সা খরচ হয়ে গেলে সেই দেশে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিল আর সেও অভাবে পড়ল। 15তাই সে সেই দেশের এক ব্যক্তির কাছে দিন মজুরীর একটা কাজ চাইল। সেই ব্যক্তি তাকে তার শুয়োর চরাবার জন্য মাঠে পাঠিয়ে দিল। 16শুয়োর যে শুঁটি খায় তা খেয়ে সে তার পেট ভরাতে চাইত, কিন্তু কেউ তাকে তাও দিত না।

17“শেষ পর্যন্ত একদিন তার চেতনা হল, আর সে বলল, ‘আমার বাবার কাছে কত মজুর পেট ভরে খেতে পায় আর এখানে আমি খিদের জ্বালায় মরছি। 18আমি উঠে আমার বাবার কাছে যাব, তাকে বলব, বাবা, আমি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে ও তোমার বিরুদ্ধে অন্যায় পাপ করেছি। 19তোমার ছেলে বলে পরিচয় দেবার কোন যোগ্যতা আর আমার নেই। তোমার চাকরদের একজনের মতো করে তুমি আমায় রাখ!’ 20এরপর সে উঠে তার বাবার কাছে গেল।

ছেলের প্রত্যাবর্তন

“সে যখন বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে আছে, এমন সময় তার বাবা তাকে দেখতে পেলেন, বাবার অন্তর দুঃখে ভরে গেল। বাবা দৌড়ে গিয়ে ছেলের গলা জড়িয়ে ধরে তাকে চুমু খেলেন। 21ছেলে তখন তার বাবাকে বলল, ‘বাবা, আমি ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ও তোমার কাছে অন্যায় ও পাপ করেছি। তোমার ছেলে বলে পরিচয় দেবার যোগ্যতা আমার নেই।’

22“কিন্তু তার বাবা চাকরদের ডেকে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি কর, সব থেকে ভাল জামাটা নিয়ে এসে একে পরিয়ে দাও। এর হাতে আংটি ও পায়ে জুতো পরিয়ে দাও। 23হৃষ্টপুষ্ট একটা বাছুর নিয়ে এসে সেটা কাট, আর এস, আমরা সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করি, আনন্দ করি! 24কারণ আমার এই ছেলেটা মারা গিয়েছিল আর এখন সে জীবন ফিরে পেয়েছে! সে হারিয়ে গিয়েছিল, এখন তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে।’ এই বলে তারা সকলে আনন্দ করতে লাগল।

বড় ছেলের প্রতিক্রিয়া

25“সেই সময় তাঁর বড় ছেলে মাঠে ছিল। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে বাজনা আর নাচের শব্দ শুনতে পেল। 26তখন সে একজন চাকরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি ব্যাপার, এসব কি হচ্ছে?’ 27চাকরটি বলল, ‘আপনার ভাই এসেছে, আর সে সুস্থ শরীরে নিরাপদে ফিরে এসেছে বলে আপনার বাবা হৃষ্টপুষ্ট বাছুর কেটে ভোজের আয়োজন করেছেন।’

28“এই শুনে বড় ছেলে খুব রেগে গেল, সে বাড়ির ভেতরে যেতে চাইল না। তখন তার বাবা বেরিয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দিলেন। 29কিন্তু সে তার বাবাকে বলল, ‘দেখ, এত বছর ধরে আমি তোমাদের সেবা করেছি, কখনও তোমার কথার অবাধ্য হই নি। তবু আমার বন্ধুদের সঙ্গে একটু আমোদ করার জন্য তুমি আমায় কখনও একটা ছাগলও দাও নি। 30কিন্তু তোমার এই ছেলে যে বেশ্যাদের পেছনে তোমার টাকা উড়িয়ে দিয়েছে, সে যখন এল তখন তুমি তার জন্য হৃষ্টপুষ্ট বাছুর কাটলে।’

31“তার বাবা তাকে বললেন, ‘বাছা, তুমি তো সব সময় আমার সঙ্গে সঙ্গে আছ; আর আমার যা কিছু আছে সবই তো তোমার। 32কিন্তু আমাদের আনন্দিত হয়ে উৎসব করা উচিত, কারণ তোমার এই ভাই মরে গিয়েছিল আর এখন সে জীবন ফিরে পেয়েছে। সে হারিয়ে গিয়েছিল, এখন তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে।’”

16

প্রকৃত সম্পদ

1এরপর যীশু তাঁর অনুগামীদের বললেন, “কোন একজন ধনী ব্যক্তির একজন দেওয়ান ছিল; আর এই দেওয়ান তার মনিবের সম্পদ নষ্ট করছে বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল। 2তখন সেই ধনী ব্যক্তি ঐ দেওয়ানকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বিষয়ে আমি এ কি শুনছি? তোমার কাজের হিসাব আমায় দাও, কারণ তুমি আর আমার দেওয়ান থাকতে পারবে না।’

3“তখন সেই দেওয়ান মনে মনে বলল, ‘এখন আমি কি করব? আমার মনিব তো আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করলেন। আমি যে মজুরের কাজ করে খাব তার ক্ষমতাও আমার নেই, আর ভিক্ষা করতেও আমার লজ্জা লাগে। 4আমার দেওয়ানী পদ গেলেও লোকে যাতে তাদের বাড়িতে আমায় থাকতে দেয় সে জন্য আমায় কি করতে হবে তা আমি জানি।’

5“তখন তার মনিবের কাছে যারা ধারে জিনিস নিয়েছিল তাদের প্রত্যেককে সে ডেকে তাদের প্রথম জনকে বলল, ‘আমার মনিবের কাছে তুমি কত ধার?’ 6সে বলল, ‘একশো মন অলিভ তেল।’ তখন সেই দেওয়ান তাকে বলল, ‘এই নাও তোমার হিসাবের কাগজটা, তাড়াতাড়ি করে লেখ, পঞ্চাশ মন।’

7“এরপর আর একজন লোককে সে বলল, ‘আর তুমি, তুমি কত ধার?’ সে বলল, ‘একশো মন গম।’ সেই দেওয়ান তাকে বলল, ‘তোমার রসিদটা দেখি, এটাতে আশি মন লেখ।’

8“সেই মনিব তাঁর অসৎ দেওয়ানের প্রশংসা করলেন, কারণ সে বুদ্ধিমানের মত কাজ করেছিল। এ জগতের লোকেরা নিজেদের মত লোকেদের সঙ্গে আচার আচরণে আত্মিক লোকদের থেকে বেশী বিচক্ষণ।

9“আমি তোমাদের বলছি, তোমাদের জাগতিক সম্পদ দিয়ে নিজেদের জন্য বন্ধু লাভ কর, যেন যখন তা শেষ হয়ে যাবে, তখন তারা তোমাদের অনন্ত আবাসে স্বাগত জানায়। 10যে সামান্য বিষয়ে বিশ্বস্ত হতে পারে, বড় ব্যাপারেও তাকে বিশ্বাস করা চলে। যে ছোটখাটো বিষয়ে অবিশ্বস্ত, সে বড় বড় বিষয়েও অবিশ্বস্ত হবে। 11তাই জাগতিক সম্পদ সম্বন্ধে তুমি যদি বিশ্বস্ত না হও, তবে প্রকৃত সত্য সম্পদের বিষয়ে কে তোমাকে বিশ্বাস করবে। 12অপরের জিনিসের ব্যাপারে তোমাদের যদি বিশ্বাস করা না যায়, তবে তোমাদের যা নিজস্ব সম্পদ তাই বা কে তোমাদের দেবে?

13“কোন দাস দুজন কর্তার দাসত্ব করতে পারে না, হয় সে একজনকে ঘৃণা করবে ও অন্যজনকে ভালবাসবে, অথবা একজনের অনুগত হয়ে অন্য জনকে তুচ্ছ করবে। তোমরা ঈশ্বর ও ধন-সম্পদ উভয়েরই দাসত্ব করতে পার না।”

ঈশ্বরের বিধি-ব্যবস্থা অপরিবর্তনীয়

(মথি 11:12-13)

14অর্থলোভী ফরীশীরা যীশুর এইসব কথা শুনে যীশুকে ব্যঙ্গ করতে লাগল। 15তখন যীশু তাদের বললেন, “তোমরা সেই রকম লোক, যারা লোকচক্ষে নিজেদের খুব ধার্মিক বলে জাহির করে থাকে, কিন্তু তোমাদের অন্তরে কি আছে ঈশ্বর তা জানেন। মানুষের চোখে যা মহান, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তা ঘৃন্য।

16“যোহন বাপ্তাইজকের সময় পর্যন্ত বিধি-ব্যবস্থা ও ভাববাদীদের শিক্ষার প্রচলন ছিল। তারপর থেকে ঈশ্বরের রাজ্যের বিষয় সুসমাচার প্রচার করা শুরু হয়েছে। আর সেই রাজ্যে প্রবেশ করার জন্য সবাই প্রবলভাবে চেষ্টা করছে। 17তবে বিধি-ব্যবস্থার এক বিন্দু বাদ পড়ার চেয়ে বরং আকাশ ও পৃথিবীর লোপ পাওয়া সহজ।

বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ

18“যে কেউ নিজের স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করে অন্য কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করে, সে ব্যভিচার করে; আর যে সেই পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিয়ে করে সেও ব্যভিচার করে।”

ধনী ব্যক্তি ও লাসারের কাহিনী

19“এক সময় একজন ধনী ব্যক্তি ছিল, সে বেগুনী রঙের কাপড় ও বহুমূল্য পোশাক পরত; আর প্রতিদিন বিলাসে দিন কাটাতো। 20তারই দরজার সামনে লাসার নামে একজন ভিখারী পড়ে থাকত, যার সারা শরীর ঘায়ে ভরে গিয়েছিল। 21সেই ধনী ব্যক্তির টেবিল থেকে টুকরো-টাকরা যে খাবার পড়ত তাই খেয়ে সে পেট ভরাবার আশায় থাকত, এমনকি কুকুররা এসে তার ঘা চেটে দিত।

22“একদিন সেই গরীব ভিখারী মারা গেল, আর স্বর্গদূতরা এসে তাকে নিয়ে গেল এবং সে অব্রাহামের কোলে স্থান পেল। সেই ধনী ব্যক্তিও একদিন মারা গেল, আর তাকে সমাধি দেওয়া হল। 23সেই ধনী ব্যক্তি পাতালে নরকে খুব যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে থাকল। এই অবস্থায় সে মুখ তুলে তাকাতে বহুদূরে অব্রাহামকে দেখতে পেল; আর অব্রাহামের কোলে সেই লাসারকে দেখতে পেল। 24সেই ধনী ব্যক্তি তখন চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হে পিতা, অব্রাহাম, আমার প্রতি দয়া করুন, লাসারকে এখানে পাঠিয়ে দিন, যেন সে এখানে এসে ওর আঙ্গুলের ডগা জলে ডুবিয়ে আমার জিভ জুড়িয়ে দেয়, কারণ আমি এই আগুনের মধ্যে বড়ই কষ্ট পাচ্ছি!’

25“কিন্তু অব্রাহাম বললেন, ‘হে আমার বৎস, মনে করে দেখ, জীবনে সুখের সব কিছুই তুমি ভোগ করেছ আর সেই সময় লাসার অনেক কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এখন এখানে সে সুখ পাচ্ছে আর তুমি কষ্ট পাচ্ছ। 26এছাড়া তোমাদের ও আমাদের মাঝে এক মহাশূন্য স্থান আছে, যাতে ইচ্ছা থাকলেও কেউ এখানে থেকে পার হয়ে তোমাদের কাছে যেতে না পারে, আর ওখান থেকে পার হয়ে কেউ আমাদের কাছে আসতে না পারে।’

27“সেই ধনী ব্যক্তি তখন বলল, ‘তাহলে পিতা দয়া করে লাসারকে আমার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন! 28যেন আমার যে পাঁচ ভাই সেখানে আছে, তাদের সে সাবধান করে দেয়, যাতে তারা এই যন্ত্রণার জায়গায় না আসে।’

29“কিন্তু অব্রাহাম বললেন, ‘মোশি ও অন্যান্য ভাববাদীরা তো তাদের জন্য আছেন, তাঁদের কথা তারা শুনুক।’

30“তখন ধনী লোকটি বলল, ‘না, না, পিতা অব্রাহাম মৃতদের মধ্য থেকে কেউ যদি তাদের কাছে যায়, তবে তারা অনুতাপ করবে।’

31“অব্রাহাম তাকে বললেন, ‘তারা যদি মোশি ও ভাববাদীদের কথা না শোনে, তবে মৃতদের মধ্য থেকে উঠে গিয়েও যদি কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলে তবু তারা তা শুনবে না।’”

17

পাপ ও ক্ষমা

(মথি 18:6-7, 21-22; মার্ক 9:42)

1যীশু তাঁর অনুগামীদের বললেন, “পাপের প্রলোভন সব সময়ই থাকবে, কিন্তু ধিক্ সেই লোক যার মাধ্যমে তা আসে। 2এই ক্ষুদ্রতমদের মধ্যে একজনকেও কেউ যদি পাপের পথে নিয়ে যায়, তবে তার গলায় এক পট্টি জাঁতা বেঁধে তাকে সমুদ্রের অতল জলে ডুবিয়ে দেওয়া তার পক্ষে ভাল। 3তোমরা নিজেদের বিষয়ে সাবধান!

“তোমার ভাই যদি পাপ করে, তাকে তিরস্কার কর। সে যদি অনুতপ্ত হয় তবে তাকে ক্ষমা কর। 4সে যদি এক দিনে সাতবার তোমার বিরুদ্ধে পাপ করে আর সাতবারই তোমার কাছে ফিরে এসে বলে, ‘আমি অনুতপ্ত,’ তবে তাকে ক্ষমা কর।”

বিশ্বাসের শক্তি

5এরপর প্রেরিতেরা প্রভুকে বললেন, “আমাদের বিশ্বাসের বৃদ্ধি করুন!”

6প্রভু বললেন, “একটা সরষে দানার মতো এতটুকু বিশ্বাস যদি তোমাদের থাকে, তাহলে এই তুঁত গাছটাকে তোমরা বলতে পার, ‘শেকড়শুদ্ধ উপড়ে নিয়ে সমুদ্রে নিজেকে পোঁত!’ আর দেখবে সে তোমাদের কথা শুনবে।

উত্তম দাস হও

7“ধর তোমাদের মধ্যে কারো একজনের দাস হাল চষছে বা ভেড়া চরাচ্ছে। সে যখন মাঠ থেকে আসে তখন তুমি কি তাকে বলবে, ‘তাড়াতাড়ি করে এস, খেতে বস?’ 8বরং তাকে কি বলবে না, ‘আমি কি খাব তার জোগাড় কর, আর আমি যতক্ষণ খাওয়া-দাওয়া করি, তুমি কোমরে গামছা জড়িয়ে আমার সেবা যত্ন কর, এরপর তুমি খাওয়া-দাওয়া করবে।’ 9ঐ দাস তোমার হুকুম অনুসারে কাজ করল বলে কি তুমি তাকে ধন্যবাদ দেবে? 10তোমাদের ক্ষেত্রে সেই একই কথা প্রযোজ্য। তোমাদের যে কাজ করতে বলা হয়েছে তা করা শেষ হলে তোমরা বলবে, ‘আমরা অযোগ্য দাস, আমরা আমাদের কর্তব্য করেছি।’”

ধন্যবাদ দাও

11যীশু জেরুশালেমের দিকে যাচ্ছিলেন, যাবার পথে তিনি গালীল ও শমরীয়ার মাঝখান দিয়ে গেলেন। 12তাঁরা যখন একটি গ্রামে ঢুকছেন, এমন সময় দশ জন কুষ্ঠরোগী তাঁর সামনে পড়ল, তারা একটু দূরে দাঁড়াল, 13ও চিৎকার করে বলল, “প্রভু যীশু! আমাদের দয়া করুন!”

14তাদের দেখে যীশু বললেন, “যাজকদের কাছে গিয়ে নিজেদের দেখাও।”

পথে যেতে যেতে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল; 15কিন্তু তাদের মধ্যে একজন যখন দেখল যে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে তখন যীশুর কাছে ফিরে এসে খুব জোর গলায় ঈশ্বরের প্রশংসা করতে লাগল। 16সে যীশুর সামনে উপুড় হয়ে পড়ে তাঁকে ধন্যবাদ জানাল। (এই লোকটি ছিল অইহুদী শমরীয়।) 17এই দেখে যীশু তাকে বললেন, “তোমাদের মধ্যে দশ জনই কি আরোগ্য লাভ করেনি? তবে বাকী নজন কোথায়? 18ঈশ্বরের প্রশংসা করার জন্য এই ভিন্ন জাতের লোকটি ছাড়া আর কেউ কি ফিরে আসেনি?” 19এরপর যীশু সেই লোকটিকে বললেন, “ওঠ, যাও, তোমার বিশ্বাসই তোমাকে সুস্থ করে তুলেছে।”

ঈশ্বরের রাজ্য তোমাদের অন্তরে

(মথি 24:23-28, 37-41)

20এক সময় ফরীশীরা যীশুকে জিজ্ঞেস করলেন, “ঈশ্বরের রাজ্য কখন আসবে?”

যীশু তাদের বললেন, “ঈশ্বরের রাজ্য এমনভাবে আসে, যা চোখে দেখা যায় না। 21লোকেরা বলবে না যে, ‘এই যে এখানে ঈশ্বরের রাজ্য’ বা ‘ওই যে ওখানে ঈশ্বরের রাজ্য।’ কারণ ঈশ্বরের রাজ্য তো তোমাদের মাঝেই আছে।”

22কিন্তু অনুগামীদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, “সময় আসবে, যখন মানবপুত্রের রাজত্বের সময়ের একটা দিন তোমরা দেখতে চাইবে, কিন্তু তোমরা তা দেখতে পাবে না। 23লোকেরা তোমাদের বলবে, ‘দেখ, তা ওখানে! বা দেখ তা এখানে!’ তাদের কথা শুনে যেও না, বা তাদের পেছনে দৌড়িও না।

24“কারণ বিদ্যুৎ চমকালে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত যেমন আলো হয়ে যায়, মানবপুত্রের দিনে তিনি সেইরকম হবেন। 25কিন্তু প্রথমে তাঁকে অনেক দুঃখভোগ করতে হবে, তাছাড়া এই যুগের লোকেরা তাঁকে অগ্রাহ্য করবে।

26“নোহের সময়ে যেমন হয়েছিল, মানবপুত্রের সময়েও তেমনি হবে। 27যে পর্যন্ত না নোহ জাহাজে উঠলেন আর বন্যা এসে লোকদের ধ্বংস করল, সেই সময় পর্যন্ত লোকেরা খাওয়া দাওয়া করছিল, বিয়ে করছিল ও বিয়ে দিচ্ছিল।

28“লোটের সময়েও সেই একই রকম হয়েছিল। তারা খাওয়া-দাওয়া করছিল, কেনা-বেচা, চাষ-বাস, গৃহ নির্মাণ সবই করত। 29কিন্তু লোট যে দিন সদোম থেকে বেরিয়ে এলেন, তারপরেই আকাশ থেকে আগুন ও গন্ধক বর্ষিত হয়ে সেখানকার সব লোককে ধ্বংস করে দিল। 30যে দিন মানবপুত্র প্রকাশিত হবেন, সেদিন এই রকমই হবে।

31“সেই দিন কেউ যদি ছাদের উপর থাকে, আর তার জিনিস পত্র যদি ঘরের মধ্যে থাকে, তবে সে তা নেবার জন্য যেন নীচে না নামে। তেমনি যদি কেউ ক্ষেতের কাজে থাকে, তবে সে কোন কিছু নিতে ফিরে না আসুক। 32লোটের স্ত্রীর+ 17:32 লোটের স্ত্রী লোটের স্ত্রীর কাহিনী আদিপুস্তক 19:15-17, 26 তে লেখা আছে। কথা যেন মনে থাকে।

33“যে তার জীবন নিরাপদ রাখতে চায়, সে তা খোয়াবে; আর যে তার জীবন হারায়, সেই তা বাঁচিয়ে রাখবে। 34আমি তোমাদের বলছি, সেই রাত্রে একই বিছানায় দুজন শুয়ে থাকবে, তাদের মধ্যে একজনকে তুলে নেওয়া হবে আর অন্যজন পড়ে থাকবে। 35দুজন স্ত্রীলোক একসঙ্গে যাঁতাতে শস্য পিষবে, একজনকে তুলে নেওয়া হবে আর অন্য জন পড়ে থাকবে।” 36+ 17:36 কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে পদ 36 যুক্ত করা হয়েছে: a “দুজন লোক একই ক্ষেত্রে থাকবে; তাদের একজনকে নেওয়া হবে, কিন্তু অন্য জনকে ছেড়ে দেওয়া হবে।”

37তখন অনুগামীরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “প্রভু, কোথায় এমন হবে?”

যীশু তাদের বললেন, “যেখানে শব, সেখানেই শকুন এসে জড়ো হবে।”

18

ঈশ্বর তাঁর লোকদের উত্তর দেবেন

1নিরাশ না হয়ে তাদের যে সব সময় প্রার্থনা করা উচিত, তা বোঝাতে গিয়ে যীশু তাদের এই দৃষ্টান্তটি দিলেন, 2তিনি বললেন, “কোন এক শহরে একজন বিচারক ছিলেন। তিনি ঈশ্বরকে ভয় করতেন না, আবার মানুষকেও গ্রাহ্য করতেন না। 3সেই শহরে একজন বিধবা ছিল। সে বার বার সেই বিচারকের কাছে এসে বলত, ‘আপনাকে দেখতে হবে যেন আমার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমি ন্যায় বিচার পাই!’ 4কিছু দিন ধরে সেই বিচারক তার কোন কথাই শুনতে চাইলেন না। কিন্তু এক সময় তিনি মনে মনে বললেন, ‘যদিও আমি ঈশ্বরকে ভয় করি না আর মানুষকে মানি না, 5তবু এই বিধবা যখন আমায় এত বিরক্ত করছে তখন আমি দেখব সে যেন ন্যায় বিচার পায়, তাহলে সে আর বার বার এসে আমাকে জ্বালাতন করবে না।’”

6এরপর প্রভু বললেন, “লক্ষ্য কর! ঐ অধার্মিক বিচারকর্তা কি বলল। 7তাহলে ঈশ্বর কি তাঁর মনোনীত লোকেরা, যাঁরা দিন-রাত তাঁকে ডাকছে, তারা যেন ন্যায় বিচার পায় তা দেখবেন না? তিনি কি তাদের সাহায্য করতে অযথা দেরী করবেন? 8আমি তোমাদের বলছি, তিনি তাদের পক্ষে ন্যায় বিচার করবেনই আর তা তাড়াতাড়িই করবেন। যাইহোক্, মানবপুত্র যখন আসবেন, তখন কি তিনি এই পৃথিবীতে বিশ্বাস দেখতে পাবেন?”

ঈশ্বরের চোখে ধার্মিকহওয়া

9যাঁরা নিজেদের ধার্মিক মনে করত আর অন্যকে তুচ্ছ করত, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি এই দৃষ্টান্তটি দিলেন, 10“দুজন লোক মন্দিরে প্রার্থনা করার জন্য গেল; তাদের মধ্যে একজন ফরীশী আর অন্য জন কর-আদায়কারী। 11ফরীশী দাঁড়িয়ে নিজের সম্বন্ধে এইভাবে প্রার্থনা করতে লাগল, ‘যে ঈশ্বর, আমি তোমায় ধন্যবাদ দিচ্ছি যে আমি অন্য সব লোকদের মতো নই; দস্যু, প্রতারক, ব্যভিচারী অথবা এই কর-আদায়কারীর মতো নই। 12আমি সপ্তাহে দুদিন উপোস করি, আর আমার আয়ের দশ ভাগের একভাগ দান করি।’

13“কিন্তু সেই কর-আদায়কারী দাঁড়িয়ে স্বর্গের দিকে মুখ তুলে তাকাতেও সাহস করল না, বরং সে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, ‘হে ঈশ্বর, আমি পাপী! আমার প্রতি দয়া কর!’ 14আমি তোমাদের বলছি, এই কর-আদায়কারী ধার্মিক প্রতিপন্ন হয়ে বাড়ি চলে গেল কিন্তু ঐ ফরীশী নয়। যে কেউ নিজেকে বড় করে তাকে ছোট করা হবে; আর যে নিজেকে ছোট করে তাকে বড় করা হবে।”

ঈশ্বরের রাজ্যে কে প্রবেশ করবে?

(মথি 19:13-15; মার্ক 10:13-16)

15লোকেরা একসময় তাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের যীশুর কাছে নিয়ে এল যেন তিনি তাদের স্পর্শ করে আশীর্বাদ করেন। এই দেখে শিষ্যরা তাদের খুব ধমক দিলেন। 16কিন্তু যীশু সেই ছেলেমেয়েদের তাঁর কাছে ডাকলেন, আর বললেন, “ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আমার কাছে আসতে দাও, তাদের বারণ করো না, কারণ এই শিশুদের মতো লোকদের জন্যই তো ঈশ্বরের রাজ্য। 17আমি তোমাদের সত্যি বলছি, যদি কেউ শিশুর মতো ঈশ্বরের রাজ্যকে গ্রহণ না করে তবে সে কোনমতে তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না!”

এক ধনী লোকের প্রশ্ন

(মথি 19:16-30; মার্ক 10:17-31)

18ইহুদীদের একজন দলনেতা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “হে সদগুরু, অনন্ত জীবন পেতে হলে আমাকে কি করতে হবে?”

19যীশু তাঁকে বললেন, “তুমি আমায় সৎ‌ বলছ, কেন? ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ সৎ‌ নয়। 20তুমি তো ঈশ্বরের সব আজ্ঞা জান, ব্যভিচার করো না, নরহত্যা করো না, চুরি করো না, মিথ্যা সাক্ষী দিও না, তোমার বাবা-মাকে সম্মান করো।”+ 18:20 উদ্ধৃতি যাত্রা 20:12-16; দ্বি. বি. 5:16-20.

21সে বলল, “আমি ছোটবেলা থেকেই সে সব পালন করে আসছি।”

22একথা শুনে যীশু তাকে বললেন, “কিন্তু তোমার মধ্যে একটি বিষয়ের এখনও ত্রুটি আছে। তোমার যা কিছু আছে সে সব বিক্রি করে তা গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দাও, তাহলে স্বর্গে তোমার ধন-সম্পদ জমা হবে, তারপর আমায় অনুসরণ কর।” 23কিন্তু এই কথা শুনে তার খুবই দুঃখ হল, কারণ তার প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল।

24যীশু তাকে দুঃখিত হতে দেখে বললেন, “যাদের ধন-সম্পদ আছে তাদের পক্ষে ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করা কত কঠিন! 25হ্যাঁ, একজন ধনীর পক্ষে ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করা অপেক্ষা ছুঁচের মধ্য দিয়ে উটের পার হওয়া সহজ।”

কারা উদ্ধার পাবে?

26যে সব লোক একথা শুনল তারা বলে উঠল, “তাহলে কে উদ্ধার পেতে পারে?”

27যীশু বললেন, “মানুষের পক্ষে যা সম্ভব নয় ঈশ্বরের পক্ষে তা সম্ভব।”

28তখন পিতর বললেন, “দেখুন, আমরা তো সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে আপনার অনুসারী হয়েছি।”

29যীশু তখন তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি যারা ঈশ্বরের রাজ্যের জন্য ঘর-বাড়ি, স্ত্রী, ভাই-বোন, মা-বাবা কিংবা ছেলে-মেয়ে ত্যাগ করেছে, 30তারা প্রত্যেকে এ জীবনেই সেই সব বহুগুণে ফিরে পাবে, এছাড়া আগামী যুগে লাভ করবে অনন্ত জীবন।”

যীশু মৃত্যু থেকে পুনরুত্থিত হবেন

(মথি 20:17-19; মার্ক 10:32-34)

31যীশু তাঁর বারোজন প্রেরিতকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, “শোন! আমরা জেরুশালেমে যাচ্ছি; আর ভাববাদীরা মানবপুত্রের বিষয়ে যা কিছু লিখে গেছেন, সে সবই পূর্ণ হবে। 32হ্যাঁ, অইহুদীদের হাতে তাঁকে তুলে দেওয়া হবে, তারা তাঁকে উপহাস করবে, গালাগালি দেবে, তাঁর গায়ে থুতু ছেটাবে। 33তারা তাঁকে কশাঘাত করবে ও শেষ পর্যন্ত হত্যাই করবে; আর তৃতীয় দিনে মৃত্যুর মধ্য থেকে তিনি পুনরুত্থিত হবেন।” 34তিনি কি বলতে চাইছেন, প্রেরিতেরা কিন্তু তার কিছুই বুঝতে পারলেন না। তিনি যে কি বলছেন তা তাঁরা বুঝতে পারলেন না, কারণ এসব কথার অর্থ তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল।

যীশু অন্ধকে দৃষ্টি দান করলেন

(মথি 20:29-34; মার্ক 10:46-52)

35যীশু যখন যিরীহোর কাছাকাছি পৌঁছালেন, তখন সেখানে রাস্তার ধারে বসে একজন অন্ধ ভিক্ষা করছিল। 36অনেক লোকজন যাওযার আওয়াজ শুনে সেই ভিখারী ব্যাপার কি তা জিজ্ঞাসা করল।

37লোকেরা তাকে বলল, “নাসরতীয় যীশু সেখান দিয়ে যাচ্ছেন।”

38তখন সে চিৎকার করে বলে উঠল, “হে দায়ূদের বংশধর যীশু, আমাকে দয়া করুন।”

39যে সব লোক সেই ভীড়ের সামনে ছিল তারা তাকে চুপ করতে বলল, কিন্তু সে আরও চিৎকার করে বলল, “হে দায়ূদের বংশধর, আমায় দয়া করুন!”

40যীশু থেমে গেলেন, তিনি সেই অন্ধকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে বললেন। সেই অন্ধ তাঁর কাছে এলে পর তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 41“তুমি কি চাও? তোমার জন্য আমি কি করব?”

সে বলল, “প্রভু, আমি যেন দেখতে পাই।”

42যীশু তাকে বললেন, “বেশ! তুমি চোখে দেখতে পাও, তোমার বিশ্বাসই তোমাকে সুস্থ করল।”

43সঙ্গে সঙ্গে সে দেখতে পেল আর ঈশ্বরের প্রশংসা করতে করতে যীশুর পেছনে পেছনে চলল। যাঁরা এই ঘটনা দেখল তারা ঈশ্বরের প্রশংসা করতে লাগল।

19

সক্কেয়

1যীশু যিরীহো শহরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। 2সেখানে সক্কেয় নামে একজন লোক ছিল। সে ছিল একজন উচ্চ-পদস্থ কর আদায়কারী ও খুব ধনী ব্যক্তি। 3কে যীশু তা দেখার জন্য সক্কেয় খুবই চেষ্টা করছিল, কিন্তু বেঁটে হওয়াতে ভীড়ের জন্য যীশুকে দেখতে পাচ্ছিল না। 4তাই সবার আগে ছুটে গিয়ে যে পথ ধরে যীশু আসছিলেন, সেই পথের পাশে একটা সুকমোর গাছে উঠল যাতে সেখান থেকে যীশুকে দেখতে পায়। 5যীশু সেখানে এসে ওপর দিকে তাকিয়ে বললেন, “সক্কেয় তাড়াতাড়ি নেমে এস, কারণ আজ আমায় তোমার ঘরে থাকতে হবে।”

6সক্কেয় তাড়াতাড়ি নেমে এসে মহানন্দে যীশুকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। 7সেখানে যারা ছিল, এই দেখে তারা সকলে অনুযোগের সুরে বলল, “উনি একজন পাপীর ঘরে অতিথি হয়ে গেলেন।”

8কিন্তু সক্কেয় উঠে দাঁড়িয়ে প্রভুকে বলল, “প্রভু দেখুন, আমি আমার সম্পদের অর্ধেক গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেব, আর যদি কাউকে ঠকিয়ে থাকি তবে তার চতুর্গুণ ফিরিয়ে দেব।”

9যীশু তাকে বললেন, “আজ এই বাড়িতে পরিত্রাণ এসেছে, যেহেতু এই মানুষটি অব্রাহামের পুত্র। 10কারণ যা হারিয়ে গিয়েছিল তা খুঁজে বার করতে ও উদ্ধার করতেই মানবপুত্র এ জগতে এসেছেন।”

ঈশ্বর প্রদত্ত জিনিস ব্যবহর কর

(মথি 25:14-30)

11যীশু জেরুশালেমের কাছাকাছি এগিয়ে গেলে লোকদের ধারণা হল যে তখনই বুঝি ঈশ্বরের রাজ্য এসে পড়ল। তাই তিনি তাদের কাছে এই দৃষ্টান্তটি দিলেন। 12যীশু বললেন, “একজন সম্ভ্রান্ত বংশের লোক রাজ পদ নিয়ে ফিরে আসার জন্য দূর দেশে যাত্রা করলেন। 13যাবার আগে তিনি তাঁর দশজন কর্মচারীকে ডেকে প্রত্যেকের হাতে একটি করে মোট দশটি মোহর দিয়ে বললেন, ‘আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এই দিয়ে ব্যবসা করো।’ 14কিন্তু তাঁর প্রজারা তাকে ঘৃণা করত; আর তিনি চলে যাওযার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় লোকেরা একজন প্রতিনিধির মাধ্যমে বলে পাঠাল, ‘আমরা চাই না যে এই লোক আমাদের রাজা হোক্!’

15“কিন্তু সেই ব্যক্তি রাজপদ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন; আর যে কর্মচারীদের তিনি টাকা দিয়েছিলেন তাদের সকলকে ডেকে পাঠালেন। তিনি দেখতে চাইলেন যে তারা কে কত লাভ করেছে। 16প্রথম জন এসে বলল, ‘প্রভু, আপনার এক মোহর খাটিয়ে দশ মোহর লাভ হয়েছে।’ 17তখন মনিব তাকে বললেন, ‘খুব ভাল করেছ, তুমি খুব ভাল কর্মচারী। তুমি অল্প বিষয়ে বিশ্বস্ত ছিলে তাই তোমাকে দশটি শহরের শাসক হিসেবে নিয়োগ করা হবে।’

18“এরপর দ্বিতীয় জন এসে বলল, ‘প্রভু আপনার এক মোহর খাটিয়ে পাঁচ মোহর লাভ হয়েছে।’ 19তিনি তাকে বললেন, ‘তোমাকে পাঁচটি শহরের শাসনভার দেওয়া হবে।’

20“এরপর আর একজন এসে বলল, ‘প্রভু, এই নিন আপনার মোহর, এটা আমি রুমালে বেঁধে আলাদা করে রেখে দিয়েছিলাম। 21আপনার বিষয়ে আমার খুব ভয় ছিল, কারণ আপনি খুব কঠিন লোক। আপনি যা জমা করেন নি তাই নিয়ে থাকেন, আর যা বোনেন না তার ফসল কাটেন।’

22“তখন তার প্রভু তাকে বললেন, ‘তোমার কথা অনুসারেই আমি তোমার বিচার করব, তুমি একজন দুষ্ট কর্মচারী। তুমি জানতে আমি একজন কঠিন লোক, আমি যা জমা করি না তাই পেতে চাই, যা বুনি না তাই কাটি। 23তবে তুমি আমার টাকা কেন মহাজনদের কাছে জমা রাখনি? তাহলে তো আমি টাকার সুদটাও অন্তত পেতাম।’ 24আর যারা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তিনি তাদের বললেন, ‘এর কাছ থেকে ঐ মোহর নিয়ে নাও আর যার দশ মোহর আছে তাকে ওটা দাও।’

25“তখন তারা তাকে বলল, ‘প্রভু, ওর তো দশটা মোহর আছে!’

26“প্রভু বললেন, ‘আমি তোমাদের বলছি, যার আছে তাকে আরো দেওয়া হবে আর যার নেই, তার যেটুকু আছে তাও কেড়ে নেওয়া হবে। 27কিন্তু যারা আমার শত্রু, যারা চায় নি যে আমি তাদের ওপর রাজত্ব করি, তাদের এখানে নিয়ে এসে আমার সামনেই মেরে ফেল।’”

যীশুর জেরুশালেমে প্রবেশ

(মথি 21:1-11; মার্ক 11:1-11; যোহন 12:12-19)

28এইসব কথা বলার পর যীশু জেরুশালেমের দিকে এগিয়ে চললেন। 29তিনি জৈতুন পর্বতের কাছে বৈৎফগী ও বৈথনিয়া গ্রামের কাছাকাছি এলে তাঁর দুজন শিষ্যকে বললেন, 30“তোমরা ঐ গ্রামে যাও। ঐ গ্রামে ঢোকার মুখেই একটা বাচ্চা গাধা বাঁধা আছে দেখবে, সেটার ওপর এর আগে কেউ কখনও বসেনি, সেটা খুলে এখানে নিয়ে এস। 31কেউ যদি তোমাদের জিজ্ঞেস করে, তোমরা ওটা খুলছ কেন? তোমরা বলো, ‘এটাকে প্রভুর দরকার আছে।’”

32যাঁদের পাঠানো হয়েছিল তাঁরা গিয়ে যীশুর কথা মতোই সব কিছু দেখতে পেলেন। 33তাঁরা যখন সেই বাচ্চা গাধাটা খুলছিলেন তখন তার মালিক এসে তাঁদের জিজ্ঞেস করল, “আপনারা এটা খুলছেন কেন?”

34তাঁরা বললেন, “এটাকে প্রভুর দরকার আছে।” 35এরপর তাঁরা গাধাটাকে যীশুর কাছে নিয়ে এসে তার ওপর তাঁদের চাদর বিছিয়ে দিলেন, আর তার পিঠে যীশুকে বসালেন। 36তিনি যখন যাচ্ছিলেন, তখন লোকেরা যাত্রা পথে নিজেদের জামা-চাদর বিছিয়ে দিচ্ছিল।

37তিনি জৈতুন পর্বতমালা থেকে নেমে যাবার রাস্তার মুখে এসে পৌঁছালেন। সেই সময় যারা তাঁর পেছনে পেছনে আসছিল, তারা যীশু যে সব অলৌকিক কাজ করেছিলেন তা দেখতে পেয়েছিল বলে আনন্দের উচ্ছাসে ঈশ্বরের প্রশংসা করতে করতে বলল,

38“‘ধন্য সেই রাজা যিনি প্রভুর নামে আসছেন!’+ 19:38 উদ্ধৃতি গীতসংহিতা 118:26.

স্বর্গে শান্তি ও ঈশ্বরের মহিমা হোক্!”

39সেই ভীড়ের মধ্য থেকে কয়েকজন ফরীশী যীশুকে বলল, “গুরু, আপনার অনুগামীদের ধমক দিন!”

40যীশু বললেন, “আমি তোমাদের বলছি, ওরা যদি চুপ করে, তবে পাথরগুলো চেঁচিয়ে উঠবে।”

জেরুশালেমের জন্য যীশু কাঁদলেন

41তিনি জেরুশালেমের কাছাকাছি এসে শহরটি দেখে কেঁদে ফেললেন। 42তিনি বললেন, “হায়! কিসে তোমার শান্তি হবে তা যদি তুমি আজ বুঝতে পারতে! কিন্তু এখন তা তোমার দৃষ্টির অগোচরে রইল। 43সেই দিন আসছে, যখন তোমার শত্রুরা তোমার চারপাশে বেষ্টনী গড়ে তুলবে। তারা তোমায় ঘিরে ধরবে আর চারপাশ থেকে চেপে ধরবে। 44তারা তোমাকে ও তোমার সন্তানদের ধ্বংস করবে। তোমার প্রাচীরের একটা পাথরের ওপর আর একটা পাথর থাকতে দেবে না, কারণ তোমার তত্ত্বাবধানের জন্য ঈশ্বর যে তোমার কাছে এলেন, এ তুমি বুঝলে না।”

যীশু মন্দিরে প্রবেশ করলেন

(মথি 21:12-17; মার্ক 11:15-19; যোহন 2:13-22)

45এরপর যীশু মন্দিরের মধ্যে ঢুকলেন আর সেখানে যারা জিনিসপত্র বিক্রি করছিল তাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দিতে লাগলেন। 46তিনি তাদের বললেন, “শাস্ত্রে লেখা আছে, ‘আমার গৃহ হবে প্রার্থনার গৃহ।’+ 19:46 উদ্ধৃতি যিশ. 56:7. কিন্তু তোমরা এটাকে ‘ডাকাতদের আড্ডাখানায়’ পরিণত করেছ।”+ 19:46 উদ্ধৃতি যির. 7:11.

47তখন থেকে প্রত্যেক দিন তিনি মন্দিরে শিক্ষা দিতে থাকলেন। প্রধান যাজকরা, ব্যবস্থার শিক্ষকরা ও ইহুদী নেতারা তাঁকে হত্যা করার উপায় খুঁজতে লাগল। 48কিন্তু তারা কোনভাবেই কোন পথ খুঁজে পেল না, কারণ সব লোকই খুব মন দিয়ে তাঁর কথাগুলি শুনত।

20

ইহুদী নেতারা যীশুকে প্রশ্ন করলেন

(মথি 21:23-27; মার্ক 11:27-33)

1একদিন যীশু যখন মন্দিরে লোকদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন এবং ঈশ্বরের সুসমাচার প্রচার করছিলেন, সেই সময় প্রধান যাজকরা, ব্যবস্থার শিক্ষকরা ও ইহুদী নেতারা একজোট হয়ে তাঁর কাছে এল। 2তারা তাঁকে প্রশ্ন করল, “কোন ক্ষমতায় তুমি এসব করছ তা আমাদের বল। কে তোমাকে এই অধিকার দিয়েছে?”

3যীশু তাদের বললেন, “আমিও তোমাদের একটা প্রশ্ন করব। 4বলো তো যোহন বাপ্তিস্ম দেবার অধিকার ঈশ্বরের কাছে থেকে পেয়েছিলেন না মানুষের কাছ থেকে?”

5তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল, “আমরা যদি বলি, ‘ঈশ্বরের কাছ থেকে,’ তাহলে ও বলবে ‘তাহলে তোমরা তাঁকে বিশ্বাস করো নি কেন?’ 6কিন্তু আমরা যদি বলি, ‘মানুষের কাছ থেকে,’ তাহলে লোকেরা আমাদের পাথর ছুঁড়ে মারবে, কারণ তারা যোহনকে একজন ভাববাদী বলেই বিশ্বাস করে।” 7তাই তারা বলল, “আমরা জানি না।”

8তখন যীশু তাদের বললেন, “তাহলে আমিও তোমাদের বলব না, কোন্ অধিকারে আমি এসব করছি।”

ঈশ্বর তাঁর পুত্রকে পাঠালেন

(মথি 21:33-46; মার্ক 12:1-12)

9যীশু এই দৃষ্টান্তটি লোকদের বললেন, “একজন লোক একটা দ্রাক্ষা ক্ষেত করে তা চাষীদের কাছে ইজারা দিয়ে বেশ কিছু দিনের জন্য বিদেশে গেল। 10ফলের সময় হলে সে তার একজন কর্মচারীকে সেই চাষীদের কাছে পাঠাল, যেন তারা ক্ষেতের ফসলের কিছু ভাগ দেয়; কিন্তু চাষীরা সেই কর্মচারীকে মারধর করে খালি হাতে তাড়িয়ে দিল। 11এরপর সে তার আর একজন কর্মচারীকে পাঠাল; কিন্তু তারা তাকেও মারধর করল। সেই কর্মচারীর প্রতি তারা জঘন্য ব্যবহার করে তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিল। 12পরে সে তার তৃতীয় কর্মচারীকে পাঠাল, চাষীরা তাকেও ক্ষতবিক্ষত করে বার করে দিল।

13“তখন সেই দ্রাক্ষা ক্ষেতের মালিক বলল, ‘আমি এখন কি করব? আমি আমার প্রিয় পুত্রকে পাঠাব, হয়তো তারা তাকে মান্য করবে।’ 14কিন্তু সেই চাষীরা সেই ছেলেকে দেখতে পেয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বলল, ‘এই হচ্ছে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, এস একে আমরা খুন করি, তাহলে আমরাই হব এই সম্পত্তির মালিক।’ 15এই বলে তারা তাকে দ্রাক্ষা ক্ষেতের বাইরে টেনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করল।

“এখন সেই ক্ষেতের মালিক তাদের প্রতি কি করবে? 16সে এসে ঐ চাষীদের মেরে ফেলবে ও ক্ষেত অন্য চাষীদের হাতে দেবে।”

এই কথা শুনে তারা সবাই বলল, “এরকম যেন না হয়!” 17কিন্তু যীশু তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে এই যে কথা শাস্ত্রে লেখা আছে এর অর্থ কি,

‘রাজমিস্ত্রিরা যে পাথরটা বাতিল করে দিল,

সেটাই হয়ে উঠল কোণের প্রধান পাথর?’+ 20:17 উদ্ধৃতি গীতসংহিতা 118:22.

18যে কেউ সেই পাথরের ওপর পড়বে, সে ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে যাবে, আর যার ওপর সেই পাথর পড়বে সে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাবে।”

19প্রধান যাজকরা ও ব্যবস্থার শিক্ষকরা সেই সময় থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য উপায় খুঁজতে লাগল; কিন্তু তারা জনসাধারণকে ভয় পাচ্ছিল। তারা যীশুকে গ্রেপ্তার করতে চাইছিল কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে যীশু তাদের বিরুদ্ধেই ঐ দৃষ্টান্তটি দিয়েছিলেন।

ইহুদী নেতারা যীশুকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করল

(মথি 22:15-22; মার্ক 12:13-17)

20তাই তারা তাঁর ওপর নজর রাখতে কয়েকজন লোককে গুপ্তচররূপে তাঁর কাছে পাঠাল, যারা ভাল লোক সেজে তাঁর কাছে গেল যাতে করে যীশুর কথা ধরে তাঁকে রোমীয় রাজ্যপালের ক্ষমতা ও বিচারের অধীনে তুলে দিতে পারে। 21তাই তারা তাঁকে একটি কথা জিজ্ঞেস করল, “গুরু, আমরা জানি যে, যা ন্যায় আপনি সেই কথাই বলেন ও সেই শিক্ষাই দেন; আর আমরা এও জানিযে আপনি কারোর প্রতি পক্ষপাত করেন না, কিন্তু ঈশ্বরের পথের বিষয়ে সত্য শিক্ষাই দেন। 22আচ্ছা, কৈসরকে কর দেওয়া কি আমাদের উচিত?”

23যীশু তাদের চালাকি ধরে ফেলেছিলেন, তাই বললেন, 24“আমায় একটা রূপোর টাকা দেখাও। এতে কার মূর্ত্তি ও কার নাম আছে?”

তারা বলল, “কৈসরের!”

25তখন তিনি তাদের বললেন, “তাহলে কৈসরের যা তা কৈসরকে দাও, আর ঈশ্বরের যা তা ঈশ্বরকে দাও।”

26সমস্ত লোকের সামনে যীশু যা বললেন, তাতে তারা তাঁর কোন ভুল ধরতে পারল না। তাঁর দেওয়া উত্তরে তারা বিস্ময়ে হতবাক্ হয়ে গেল।

কিছু সদ্দূকীর যীশুকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা

(মথি 22:23-33; মার্ক 12:18-27)

27তখন সদ্দূকী সম্প্রদায়ের কয়েকজন লোক যীশুর কাছে এল। এই সদ্দূকীরা বলত, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান বলে কিছু নেই। তারা এসে যীশুকে প্রশ্ন করল, 28“গুরু, মোশি আমাদের জন্য লিখে রেখে গেছেন যে নিঃসন্তান অবস্থায় যদি কোন লোক তার স্ত্রীকে রেখে মারা যায়, তবে তার ভাই সেই স্ত্রীকে বিয়ে করে ভাইয়ের হয়ে তার বংশ রক্ষা করবে। 29এরকম একজন যারা সাত ভাই ছিল, তাদের প্রথম ভাই বিয়ে করার পর নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেল। 30দ্বিতীয় ভাই তখন সেই বিধবাকে বিয়ে করল। 31এরপর তৃতীয় ভাই, এইভাবে সাত ভাই-ই একজন স্ত্রীকে বিয়ে করল আর তারা সকলেই নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেল। 32পরে সেই স্ত্রীও মারা গেল। 33এখন পুনরুত্থানের সময়ে সে কার স্ত্রী হবে? কারণ সাত জনই তো তাকে বিয়ে করেছিল?”

34তখন যীশু তাদের বললেন, “এই যুগের লোকরাই বিয়ে করে আর তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। 35কিন্তু মৃত্যু থেকে পুনরুত্থিত হয়ে আগামী যুগের যোগ্য বলে যাদের গন্য করা হবে, তারা বিয়ে করবে না বা তাদের বিয়ে দেওয়াও হবে না। 36তারা আর মরতে পারে না, কারণ তারা স্বর্গদূতদের মতো, মৃত্যু থেকে পুনরুত্থিত হয়েছে বলে তারা ঈশ্বরের সন্তান। 37জ্বলন্ত ঝোপের+ 20:37 জ্বলন্ত ঝোপ দ্রষ্টব্য যাত্রা 3:1-12. বিষয়ে যেখানে লেখা হয়েছে, সেখানে মোশিও দেখিয়েছেন যে মৃতেরা পুনরুত্থিত হয়। সেখানে মোশি প্রভু ঈশ্বরকে ‘অব্রাহামের ঈশ্বর, ইস‌্হাকের ঈশ্বর, ও যাকোবের ঈশ্বর+ 20:37 আব্রাহাম … ঈশ্বর যাত্রা 3:6 হইতে উদ্ধৃত। বলে উল্লেখ করেছেন।’ 38ঈশ্বর মৃত লোকদের ঈশ্বর নন, তিনি জীবিত লোকদেরই ঈশ্বর। যারা আগামী যুগের যোগ্য লোক তারা সকলেই ঈশ্বরের চোখে জীবিত থাকে।”

39ব্যবস্থার শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন বলল, “গুরু, আপনি ঠিকই বলেছেন!” 40এরপর তাঁকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস কারো হল না।

খ্রীষ্ট কি দায়ূদের পুত্র?

(মথি 22:41-46; মার্ক 12:35-37)

41কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “তারা কি করে বলে যে খ্রীষ্ট রাজা দায়ূদের পুত্র? 42কারণ গীতসংহিতায় দায়ূদ নিজেই বলেছেন,

‘প্রভু পরমেশ্বর আমার প্রভুকে বললেন,

43যতদিন না আমি তোমার শত্রুদের তোমার পাদপীঠে পরিণত করি,

তুমি আমার ডানদিকে বস।’+ 20:43 উদ্ধৃতি গীতসংহিতা 110:1.

44দায়ূদ তো খ্রীষ্টকে এইভাবে ‘প্রভু’ বলে সম্বোধন করলেন, তাহলে খ্রীষ্ট কিভাবে তাঁর সন্তান হলেন?”

ব্যবস্থার শিক্ষকদের প্রতি সতর্কবাণী

(মথি 23:1-36; মার্ক 12:38-40; লূক 11:37-54)

45সমস্ত লোক যখন এসব কথা শুনছিল, তখন যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন, 46“ব্যবস্থার শিক্ষকদের থেকে সাবধান। তারা লম্বা লম্বা পোশাক পরে ঘুরে বেড়াতে ও হাটে বাজারে লোকদের কাছ থেকে সম্মান পেতে ভালবাসে; আর সমাজগৃহে বিশেষ সম্মানের স্থানে বসতে ও ভোজসভায় সম্মানের আসন দখল করতেও ভালবাসে। 47তারা একদিকে লোক দেখানো লম্বা লম্বা প্রার্থনা করে, অপরদিকে বিধবাদের সর্বস্ব গ্রাস করে, এদের ভয়ঙ্কর শাস্তি হবে।”

21

প্রকৃত দান

(মার্ক 12:41-44)

1যীশু তাকিয়ে দেখলেন, ধনী লোকেরা মন্দিরের দানের বাক্সে তাদের দান রাখছে। 2এরই মাঝে একজন অতি গরীব বিধবা তাতে খুব ছোট্ট ছোট্ট তামার মুদ্রা রাখল। 3তখন যীশু বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি বলছি, এই গরীব বিধবা অন্য আর সকলের থেকে অনেক বেশী দান করল। 4আমি একথা বলছি কারণ অন্য আর সব লোক তাদের সম্পত্তির বাড়তি অংশ ঐ বাক্সে ফেলে গেল, কিন্তু এই বিধবার অভাব থাকা সত্ত্বেও জীবন ধারণের জন্য তার যা সম্বল ছিল, তার সবটাই দিয়ে গেল।”

মন্দির ধ্বংস

(মথি 24:1-14; মার্ক 13:1-13)

5শিষ্যদের মধ্যে কেউ কেউ সেই মন্দিরের বিষয়ে এই মন্তব্য করলেন যে, “সুন্দর সুন্দর পাথর দিয়ে ও ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দানের জিনিস দিয়ে এই মন্দিরকে কেমন সাজানো হয়েছে!”

6যীশু তাঁদের বললেন, “এই যে সব জিনিস তোমরা দেখছ, সময় আসবে যখন এর একটা পাথর আর একটার ওপর থাকবে না, সব ভেঙে ফেলা হবে।”

7শিষ্যরা তখন যীশুকে জিজ্ঞেস করলেন, “গুরু এসব কখন ঘটবে? এবং কি চিহ্ন দেখে বোঝা যাবে এসব ঘটবার সময় এসে গেছে?”

8যীশু বললেন, “সাবধান! কেউ যেন তোমাদের না ভোলায়, কারণ অনেকেই আমার নাম ধারণ করে আসবে আর বলবে, ‘আমিই তিনি’ আর তারা বলবে, ‘সময় ঘনিয়ে এসেছে।’ তাদের অনুসারী হয়ো না! 9তোমরা যখন যুদ্ধ ও বিদ্রোহের কথা শুনতে পাবে, তাতে ভয় পেও না, কারণ প্রথমে নিশ্চয়ই এসব হবে; কিন্তু তখনও শেষ সময় আসতে বাকী থাকবে!”

10এরপর তিনি তাদের বললেন, “এক জাতি আর এক জাতির বিরুদ্ধে, এক রাজ্য আর এক রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। 11মহা ভূমিকম্প হবে, বিভিন্ন জায়গায় দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দেবে; আর আকাশের বুকে ভয়াবহ ঘটনা ও মহৎ‌ চিহ্ন দেখতে পাবে।

12“কিন্তু এসব ঘটনা ঘটার আগে, তারা তোমাদের গ্রেপ্তার করবে, তোমাদের প্রতি নির্যাতন করবে। তারা বিচারের জন্য তোমাদের সমাজ-গৃহে সঁপে দেবে ও তোমাদের কারাগারে ভরবে। আমারই কারণে তারা তোমাদের রাজাদের ও রাজ্যপালদের সামনে টেনে নিয়ে যাবে। 13তাতে আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দেবার জন্য তোমরা সুযোগ পাবে। 14তোমরা মনের দিক থেকে তৈরী থেকো; আত্মপক্ষ সমর্থন করতে তখন কি বলবে, কি জবাবদিহি করবে তার জন্য চিন্তা করো না। 15কারণ সেই সময় আমি তোমাদের বুদ্ধি দেব, তোমাদের মুখে এমন কথা যোগাব যে তোমাদের বিপক্ষরা তা অস্বীকার করতে পারবে না আবার তার প্রতিবাদও করতে পারবে না। 16কিন্তু তোমাদের আপন বাবা-মা ভাই ও আত্মীয় বন্ধুরাই তোমাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে তোমাদের ধরিয়ে দেবে; এমন কি তোমাদের কাউকে কাউকে মেরেও ফেলবে। 17আমারই কারণে তোমরা সকলের কাছে ঘৃণার পাত্র হবে। 18কিন্তু তোমাদের মাথায় একটা চুলও নষ্ট হবে না। 19তোমরা যদি বিশ্বাসে স্থির থাক, তবেই তোমাদের প্রাণ রক্ষা পাবে।

জেরুশালেমের ধ্বংসের দিন

(মথি 24:15-21; মার্ক 13:14-19)

20“তোমরা যখন দেখবে যে সৈন্যসামন্তরা জেরুশালেমকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে, তখন বুঝবে যে তার ধ্বংসের সময় ঘনিয়ে এসেছে। 21তখন যারা যিহূদিয়ায় থাকবে তারা যেন পালিয়ে যায়। যারা জেরুশালেমে থাকবে তারা যেন অবশ্যই নগর ছেড়ে পালায়; আর যারা গ্রামে থাকবে তারা যেন নগরে না আসে। 22কারণ এই দিনগুলো হচ্ছে শাস্তির দিন, যা শাস্ত্রের বাণী অনুসারে পূর্ণ হবে। 23ঐ দিনগুলোতে যাদের প্রসবকাল ঘনিয়ে এসেছে ও যাদের কোলে দুধের বাচ্চা আছে, সেই সব স্ত্রীলোকদের ভয়ঙ্কর দুর্দশা হবে। আমি একথা বলছি কারণ দেশে মহাসংকট আসছে ও এই লোকদের ওপর ঈশ্বরের ক্রোধ নেমে আসছে। 24তরবারির আঘাতে তারা মারা পড়বে, আর তাদের বন্দী করে সকল জাতির কাছে নিয়ে যাওযা হবে। যতদিন না অইহুদীদের নিরুপিত সময় পূর্ণ হচ্ছে, জেরুশালেম অইহুদীদের দ্বারা অবজ্ঞা ভরে পদদলিত হবে।

ভয় করো না

(মথি 24:29-31; মার্ক 13:24-27)

25“তখন চাঁদ, সূর্য্য ও তারাগুলিতে অনেক বিস্ময়কর জিনিস দেখা যাবে। পৃথিবীতে সমস্ত জাতি হতাশায় ভুগবে। তারা সমুদ্র গর্জন শুনে ও প্রচণ্ড ঢেউ দেখে ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়বে। 26পৃথিবীতে যে ভয়ঙ্কর অবস্থা আসছে তার কথা ভেবে ভয়েতে লোকে অজ্ঞান হয়ে যাবে, কারণ আকাশের সব শক্তিগুলি ওলোট-পালট হয়ে যাবে। 27এর পরই তারা মহাপরাক্রমে ও মহিমামণ্ডিত হয়ে মানবপুত্রকে মেঘের মধ্যে আসতে দেখবে। 28এসব ঘটনা ঘটতে দেখলে মাথা তুলে উঠে দাঁড়িও, কারণ জেনো যে তখন তোমাদের মুক্তি আসছে!”

আমার বাক্য চিরজীবি

(মথি 24:32-35; মার্ক 13:28-31)

29এরপর যীশু তাদের একটি দৃষ্টান্ত দিলেন, “ডুমুর গাছ ও অন্যান্য গাছের দিকে দেখ। 30যে মুহূর্তে তাদের নতুন পাতা গজায়, তা দেখে তোমরা বুঝতে পার যে গ্রীষ্মকাল এসে পড়ল বলে। 31ঠিক সেই রকম এইসব ঘটতে দেখলে তোমরা বুঝবে যে ঈশ্বরের রাজ্য এসে পড়েছে।

32“আমি তোমাদের সত্যি বলছি, যতক্ষণ না এসব ঘটছে, এই বংশ লোপ পাবে না। 33আকাশ ও পৃথিবী লোপ পাবে, কিন্তু আমার বাক্য কখনও লোপ পাবে না।

সর্বদাই প্রস্তুত থেকো

34“তোমরা সতর্ক থেকো। উচ্ছৃঙ্খল আমোদ-প্রমোদে, মত্ততায়, জাগতিক ভাবনা চিন্তায় তোমাদের মন যেন আচ্ছন্ন না হয়ে পড়ে, আর সেই দিন হঠাৎ‌ ফাঁদের মতো তোমাদের ওপর এসে না পড়ে। 35বাস্তবিক, পৃথিবীর সব লোকের জন্যই সেই দিন আসবে। 36তাই সব সময় সজাগ থেকো, আর প্রার্থনা করো যেন যাই ঘটুক না কেন তা কাটিয়ে উঠবার ও মানবপুত্রের সামনে দাঁড়াবার শক্তি তোমাদের থাকে।”

37তিনি মন্দিরের মধ্যে প্রতিদিন শিক্ষা দিতেন কিন্তু সন্ধ্যা হলে রাতে থাকার জন্য জৈতুন পর্বতে চলে যেতেন। 38প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে লোকেরা তাঁর কথা শোনার জন্য মন্দিরে যেত।

22

ইহুদী নেতারা যীশুকে হত্যা করতে চাইল

(মথি 26:1-5, 14-16; মার্ক 14:1-2, 10-11; যোহন 11:45-53)

1সেই সময় খামিরবিহীন রুটির পর্ব এগিয়ে এলো, এই পর্বকে নিস্তারপর্ব বলা হত। 2এদিকে প্রধান যাজকরা ও ব্যবস্থার শিক্ষকরা যীশুকে হত্যা করার উপায় খুঁজতে লাগল, কারণ তারা লোকদের ভয় করত।

যীশুর বিরুদ্ধে যিহূদার ষড়যন্ত্র

(মথি 26:14-16; মার্ক 14:10-11)

3এই সময় যিহূদা, যে ছিল বারো জন প্রেরিতের মধ্যে একজন, যাকে যিহূদা ঈষ্করিয়োতীয় বলা হত, তার অন্তরে শয়তান ঢুকল। 4যিহূদা কেমন করে যীশুকে ধরিয়ে দেবে সে বিষয়ে পরামর্শ করতে প্রধান যাজকদের ও মন্দিরের রক্ষীবাহিনীর পদস্থ কর্মচারীদের কাছে গেল। 5তারা যিহূদার কথা শুনে খুবই খুশী হয়ে তাকে এর জন্য টাকা দিতে রাজী হল। 6যিহূদাও সম্মত হয়ে যখন লোকের ভীড় থাকবে না সেই সময় যীশুকে ধরিয়ে দেবার সুযোগ খুঁজতে লাগল।

নিস্তারপর্বের ভোজের আয়োজন

(মথি 26:17-25; মার্ক 14:12-21; যোহন 13:21-30)

7এরপর খামিরবিহীন রুটির দিন এল, যে দিনে নিস্তারপর্বের মেষ বলি দিতে হত। 8তাই যীশু পিতর ও যোহনকে বললেন, “যাও, আমাদের জন্য নিস্তারপর্বের ভোজ প্রস্তুত কর, যেন আমরা তা গিয়ে খেতে পারি।”

9তাঁরা যীশুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কোথায় চান, আমরা কোথায় তা প্রস্তুত করব?”

10যীশু তাঁদের বললেন, “শোন! তোমরা শহরে ঢোকার মুখেই দেখতে পাবে একজন লোক এক কলসী জল নিয়ে যাচ্ছে। তার পেছনে পেছনে গিয়ে সে যে বাড়িতে ঢুকবে, 11সেই বাড়ির মালিককে বলবে, ‘গুরু বলেছেন, আপনার সেই অতিথিঘর কোনটা, যেখানে আমি আমার শিষ্যদের সঙ্গে নিস্তারপর্বের ভোজ খেতে পারি।’ 12তখন সেই লোকটি তোমাদের ওপর তলার একটি বড় সাজানো ঘর দেখিয়ে দেবে। তোমরা সেখানেই আয়োজন করো।”

13যীশু যেমন বলেছিলেন, তাঁরা গিয়ে সেরকমই দেখতে পেলেন আর নিস্তারপর্বের ভোজ প্রস্তুত করলেন।

প্রভুর ভোজ

(মথি 26:26-30; মার্ক 14:22-26; 1 করিন্থীয় 11:23-25)

14তারপর সময় হলে যীশু তাঁর প্রেরিতদের সঙ্গে গিয়ে নিস্তারপর্বের ভোজ খেতে এলেন। 15তিনি তাঁদের বললেন, “আমার কষ্টভোগের আগে তোমাদের সঙ্গে এই নিস্তারপর্বের ভোজ খেতে আমি খুবই ইচ্ছা করেছি। 16কারণ আমি তোমাদের বলছি, যতদিন না ঈশ্বরের রাজ্যে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় ততদিন পর্যন্ত আমি এই ভোজ আর খাবো না।”

17এরপর তিনি দ্রাক্ষারসের পেয়ালা হাতে নিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, “এই নাও, নিজেদের মধ্যে এটা ভাগ করে নাও। 18কারণ আমি তোমাদের বলছি, ঈশ্বরের রাজ্য না আসা পর্যন্ত আমি আর দ্রাক্ষারস পান করব না।”

19এরপর তিনি রুটি নিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে তা খণ্ড খণ্ড করলেন, আর তা প্রেরিতদের দিয়ে বললেন, “এ আমার শরীর, যা তোমাদের জন্য দেওয়া হল। আমার স্মরনার্থে তোমরা এটা করো।” 20খাবার পর সেইভাবে দ্রাক্ষারসের পেয়ালা নিয়ে বললেন, “আমার রক্তের মাধ্যমে মানুষের জন্য ঈশ্বরের দেওয়া যে নতুন নিয়ম শুরু হল। এই পানপাত্রটি তারই চিহ্ন। এই রক্ত তোমাদের সকলের জন্য পাতিত হল।”

কে যীশুর বিরুদ্ধে যাবে?

21“কিন্তু দেখ! যে আমাকে ধরিয়ে দেবে তার হাত আমার সঙ্গে এই টেবিলের ওপরেই আছে। 22কারণ যেমন নির্ধারিত হয়েছে সেই অনুসারেই মানবপুত্রকে মরতে হবে, কিন্তু ধিক্ সেই লোককে যে তাঁকে ধরিয়ে দেবে।”

23তাঁরা নিজেদের মধ্যে তখন একে অপরকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, “আমাদের মধ্যে কে এমন লোক হতে পারে, যে এই কাজ করবে?”

দাসের মতো হও

24সেই সময় তাঁদের মধ্যে কাকে সব থেকে বড় বলা হবে, এই নিয়ে তর্ক শুরু হল। 25কিন্তু যীশু তাদের বললেন, “অইহুদীদের মধ্যেই রাজারা তাদের প্রজাদের ওপরে কর্তৃত্ত্ব করে, আর যারা তাদের শাসন করে থাকে তাদেরই আবার ‘উপকারক’ বলা হয়। 26কিন্তু তোমাদের মধ্যে এমনটি হওয়া উচিত নয়। তোমাদের মধ্যে যে সব থেকে বড় সে হোক্ সবার চেয়ে ছোটর মতো আর যে নেতা সে হোক্ দাসের মতো। 27কে প্রধান, যে খেতে আসে, না যে পরিবেশন করে? যে খেতে আসে, সেই নয় কি? কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে দাসের মতো আছি।

28“আমার পরীক্ষার সময় তোমরাই তো আমার পাশে দাঁড়িয়েছ। 29তাই আমার পিতা যেমন আমার রাজত্ব করার ক্ষমতা দিয়েছেন, তেমনি আমিও তোমাদের সেই ক্ষমতা দান করছি। 30যেন আমার রাজ্যে তোমরা আমার সঙ্গে পান আহার করতে পার, আর তোমরা সিংহাসনে বসে ইস্রায়েলের বারো বংশের বিচার করবে।

বিশ্বাস হারিও না

(মথি 26:31-35; মার্ক 14:27-31; যোহন 13:36-38)

31“শিমোন, শিমোন, শয়তান গমের মতো চেলে বার করবার জন্য তোমাদের সকলকে চেয়েছে। 32কিন্তু শিমোন, আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করছি, যেন তোমার বিশ্বাসে ভাঙ্গন না ধরে; আর তুমি যখন আবার পথে ফিরে আসবে তখন তোমার ভাইদের বিশ্বাসে শক্তিশালী করে তুলো।”

33কিন্তু পিতর বললেন, “প্রভু, আমি আপনার সঙ্গে কারাগারে যেতে, এমনকি মরতেও প্রস্তুত।”

34যীশু বললেন, “পিতর আমি তোমায় বলছি, আজ রাতে মোরগ ডাকার আগেই তুমি তিনবার অস্বীকার করে বলবে যে তুমি আমায় চেন না।”

কষ্টের জন্য প্রস্তুত হও

35এরপর যীশু তাঁর প্রেরিতদের বললেন, “আমি যখন টাকার থলি, ঝুলি ও জুতো ছাড়াই তোমাদের প্রচারে পাঠিয়েছিলাম তখন কি তোমাদের কোন কিছুর অভাব হয়েছিল?”

তাঁরা বললেন, “না, কিছুরই অভাব হয় নি।”

36যীশু তাঁদের বললেন, “কিন্তু এখন বলছি, যার টাকার থলি বা ঝুলি আছে সে তা নিয়ে যাক; আর যার কাছে তলোয়ার নেই সে তার পোশাক বিক্রি করে একটা তলোয়ার কিনুক। 37কারণ আমি তোমাদের বলছি:

‘তিনি দোষীদের একজন বলে গন্য হবেন।’+ 22:37 উদ্ধৃতি যিশাইয় 53:12.

শাস্ত্রের এই যে কথা তা অবশ্যই আমাতে পূর্ণ হবে: হ্যাঁ, আমার বিষয়ে এই যে কথা লেখা আছে তা পূর্ণ হতে চলেছে।”

38তাঁরা বললেন, “প্রভু, দেখুন দুটি তলোয়ার আছে!”

তিনি তাঁদের বললেন, “থাক, এই যথেষ্ট।”

যীশু প্রেরিতদের প্রার্থনা করতে বললেন

(মথি 26:36-46; মার্ক 14:32-42)

39 এরপর তিনি তাঁর নিয়ম অনুসারে জৈতুন পর্বতমালায় চলে গেলেন। শিষ্যরা তাঁর পেছন পেছনে চললেন। সেই জায়গায় পৌঁছে তিনি তাঁদের বললেন, “প্রার্থনা কর যেন তোমরা প্রলোভনে না পড়।”

41পরে তিনি শিষ্যদের থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন। 42তিনি বললেন, “পিতা যদি তোমার ইচ্ছা হয় তবে এই পানপাত্র আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও। হ্যাঁ, তবুও আমার ইচ্ছা নয়, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক্!” 43এরপর স্বর্গ থেকে একজন স্বর্গদূত এসে তাঁকে শক্তি জোগালেন। 44নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে যীশু আরও আকুলভাবে প্রার্থনা করতে লাগলেন। সেই সময় তাঁর গা দিয়ে রক্তের বড় বড় ফোঁটার মতো ঘাম ঝরে পড়ছিল।+ 22:44 কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে পদ 43 এবং 44 পাওয়া যায় নাই।45প্রার্থনা থেকে উঠে তিনি শিষ্যদের কাছে এসে দেখলেন, মনের দুঃখে অবসন্ন হয়ে তারা সকলে ঘুমিয়ে পড়েছেন। 46তিনি তাঁদের বললেন, “তোমরা ঘুমাচ্ছ কেন? ওঠ, প্রার্থনা কর যেন প্রলোভনে না পড়।”

যীশু বন্দী হলেন

(মথি 26:47-56; মার্ক 14:43-50; যোহন 18:3-11)

47তিনি তখনও কথা বলছেন, সেই সময় যিহূদার নেতৃত্বে একদল লোক সেখানে এসে হাজির হল। যিহূদা চুমু দিয়ে অভিবাদন করার জন্য যীশুর দিকে এগিয়ে গেল।

48যীশু তাকে বললেন, “যিহূদা তুমি কি চুমু দিয়ে মানবপুত্রকে ধরিয়ে দেবে?” 49যীশুর চারপাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তখন বুঝতে পারলেন কি ঘটতে চলেছে। তাঁরা বললেন, “প্রভু, আমরা কি তলোয়ার নিয়ে ওদের আক্রমণ করব?” 50তাঁদের মধ্যে একজন মহাযাজকের চাকরের ডান কান কেটে ফেললেন।

51এই দেখে যীশু বললেন, “থামো! খুব হয়েছে।” আর তিনি সেই চাকরের কান স্পর্শ করে তাকে সুস্থ করলেন।

52এরপর যীশু, যারা তাঁকে ধরতে এসেছিল, সেই প্রধান যাজক, মন্দির রক্ষী বাহিনীর পদস্থ কর্মচারীদের ও ইহুদী সমাজপতিদের উদ্দেশ্যে বললেন, “ডাকাত ধরতে লোকে যেমন বার হয় তোমরাও কি সেরকম ছোরা ও লাঠি নিয়ে আমাকে ধরতে এসেছ? 53প্রত্যেক দিনই তো আমি তোমাদের মাঝে মন্দিরেই ছিলাম, তখন তো তোমরা আমায় স্পর্শ কর নি! কিন্তু এই তোমাদের সময়, অন্ধকারের রাজত্বের এই তো সময়।”

যীশুকে স্বীকার করতে পিতরের ভয়

(মথি 26:57-58, 69-75; মার্ক 14:53-54, 66-72; যোহন 18:12-18, 25-27)

54তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করে মহাযাজকের বাড়িতে নিয়ে চলল। পিতর কিন্তু দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পেছনে পেছনে চললেন। 55মহাযাজকের বাড়ির উঠোনের মাঝখানে লোকেরা আগুন জ্বেলে তার চারপাশে বসল, পিতরও তাদের সঙ্গে বসলেন। 56একজন চাকরাণী দেখল যে পিতর সেই আগুনের ধারে বসেছেন। সে পিতরকে খুব ভালভাবে দেখে নিয়ে বলল, “আরে, এই লোকটাও তো ওর সঙ্গী ছিল!”

57কিন্তু পিতর অস্বীকার করে বললেন, “এই মেয়ে, আমি ওঁকে চিনি না।” 58এর কিছুক্ষণ পরে আর একজন পিতরকে দেখে বলল, “আরে, তুমিও তো ওদেরই দলের একজন!”

কিন্তু পিতর বললেন, “না, মশায়, আমি নই।”

59এর প্রায় একঘন্টা পরে আর একজন বেশ জোর দিয়ে বলল, “নিঃসন্দেহে এ লোকটা ওরই সঙ্গী ছিল, কারণ এ তো একজন গালীলীয়!”

60কিন্তু পিতর বললেন, “মশায়, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনি কি বলছেন।”

পিতরের কথা শেষ না হতেই একটা মোরগ ডেকে উঠল। 61তখন প্রভু মুখ ফিরিয়ে পিতরের দিকে তাকালেন, আর প্রভুর কথা পিতরের মনে পড়ে গেল, প্রভু বলেছিলেন, “আজ রাতে মোরগ ডাকার আগে, তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার করবে।” 62তখন তিনি বাইরে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।

লোকেরা যীশুকে উপহাস করল

(মথি 26:67-68; মার্ক 14:65)

63যারা যীশুকে পাহারা দিচ্ছিল, তারা এই সময় তাঁকে বিদ্রূপ করতে ও মারতে শুরু করল। 64তারা যীশুর চোখ বেঁধে দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, “ভাববাণী বল দেখি, কে তোকে মারল!” 65তাঁকে অপমান করার জন্য তারা অনেক কথা বলল।

ইহুদী নেতাদের সামনে যীশু

(মথি 26:59-66; মার্ক 14:55-64; যোহন 18:19-24)

66দিন শুরু হলে প্রবীন নেতারা, প্রধান যাজরা, ব্যবস্থার শিক্ষকরা সকলে মিলে সভা ডাকল আর সেই সভায় তারা যীশুকে হাজির করল। 67তারা বলল, “তুমি যদি খ্রীষ্ট হও, তবে আমাদের বল!”

যীশু তাদের বললেন, “আমি যদি বলি, তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস করবে না: 68আর আমি যদি তোমাদের কিছু জিজ্ঞেস করি, তোমরা তার জবাব দেবে না। 69কিন্তু মানবপুত্র এখন থেকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ডানদিকে বসে থাকবেন।”

70তখন তারা সকলে বলল, “তাহলে তুমি ঈশ্বরের পুত্র?” তিনি জবাব দিলেন, “তোমরা ঠিকই বলেছ যে আমি সেই।”

71তারা বলল, “আমাদের আর অন্য সাক্ষ্যের কি দরকার? আমরা তো ওর নিজের মুখের কথাই শুনলাম।”

23

রাজ্যপাল পীলাত যীশুকে প্রশ্ন করলেন

(মথি 27:1-2, 11-14; মার্ক 15:1-5; যোহন 18:28-38)

1এরপর তারা সকলে উঠে প্রভু যীশুকে নিয়ে পীলাতের কাছে গেল। 2আর তারা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলল, “আমরা দেখেছি, লোকটা আমাদের জাতিকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। এ কৈসরকে কর দিতে বারণ করে আর বলে, সে নিজেই খ্রীষ্ট, একজন রাজা।”

3তখন পীলাত যীশুকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি ইহুদীদের রাজা?”

যীশু তাঁকে বললেন, “তুমি নিজেই সে কথা বললে।”

4এরপর পীলাত প্রধান যাজক ও লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, “এই লোকের বিরুদ্ধে কোন দোষই আমি খুঁজে পাচ্ছি না।”

5কিন্তু তারা জেদ ধরে বলতে লাগল, “এই লোকটি যিহূদার সমস্ত জায়গায় শিক্ষা দিয়ে লোকদের ক্ষেপিয়ে তুলছে। গালীল থেকে শুরু করে এখন সে এখানে এসেছে।”

পীলাত যীশুকে হেরোদের কাছে পাঠালেন

6এই কথা শুনে পীলাত জানতে চাইলেন যীশু গালীলের লোক কিনা। 7তিনি যখন জানতে পারলেন যে হেরোদের শাসনাধীনে যে অঞ্চল আছে যীশু সেখানকার লোক, তখন তিনি যীশুকে হেরোদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন, কারণ হেরোদ তখন জেরুশালেমেই ছিলেন।

8রাজা হেরোদ যীশুকে দেখে খুবই খুশী হলেন, কারণ তিনি অনেকদিন থেকেই তাঁকে দেখতে চাইছিলেন। তাঁর বিষয়ে হেরোদ অনেক কথাই শুনেছিলেন এবং আশা করেছিলেন যে যীশু কোন অলৌকিক কাজ করে তাঁকে দেখাবেন। 9তিনি যীশুকে অনেক প্রশ্ন করলেন; কিন্তু যীশু তাকে কোন উত্তরই দিলেন না। 10প্রধান যাজকরা ও ব্যবস্থার শিক্ষকরা সেখানে দাঁড়িয়ে প্রবলভাবে যীশুর বিরুদ্ধে দোষারোপ করতে লাগল। 11হেরোদ তার সৈন্যদের নিয়ে যীশুকে নানাভাবে অপমান ও উপহাস করলেন। পরে একটা সুন্দর আলখাল্লা পরিয়ে তাঁকে আবার পীলাতের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। 12এর আগে পীলাত ও হেরোদ পরস্পর শত্রু ছিলেন; কিন্তু ঐ দিন তাঁরা পরস্পর আবার বন্ধু হয়ে গেলেন।

যীশুর মৃত্যু অবধারিত

(মথি 27:15-26; মার্ক 15:6-15; যোহন 18:39-19:16)

13পীলাত প্রধান যাজকদের ও ইহুদী নেতাদের ডেকে বললেন, 14“তোমরা আমার কাছে এই লোকটিকে নিয়ে এসে বলছ যে এ লোকদের বিপথে চালিত করছে। তোমাদের সামনেই আমি ভালভাবে একে জেরা করে দেখলাম; আর তোমরা এর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করছ তার কোন প্রমাণই পেলাম না, সে নির্দোষ। 15এমন কি রাজা হেরোদও পান নি, তাই তিনি একে আবার আমাদের কাছে ফেরত পাঠিয়েছেন। আর দেখ, মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য কোন কাজই এ করে নি। 16তাই একে আমি আচ্ছা করে চাবুক মেরে ছেড়ে দেব।” 17+ 23:17 লূকের কোন কোন গ্রীক প্রতিলিপিতে পদ 17 যুক্ত করা হয়েছে: a “প্রতি বছর নিস্তারপর্বের দিন পীলাত লোকদের উদ্দেশ্যে কারাগার থেকে একজনকে মুক্তি দিতেন।”

18কিন্তু তারা সকলে এক সঙ্গে চিৎকার করে বলে উঠল, “এই লোকটাকে দূর কর! আমাদের জন্য বারাব্বাকে ছেড়ে দাও!” 19শহরের মধ্যে গণ্ডগোল বাধানো ও হত্যার অপরাধে বারাব্বাকে কারাবন্দী করা হয়েছিল।

20পীলাত যীশুকে ছেড়ে দিতে চাইলেন, তাই তিনি আবার লোকদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন। 21কিন্তু তারা চিৎকার করেই চলল, “ওকে ক্রুশে দাও, ক্রুশে দাও।”

22পীলাত তৃতীয় বার তাদের বললেন, “কেন? এই লোক কি অপরাধ করেছে? মৃত্যুদণ্ড দেবার মতো কোন দোষই তো এর আমি দেখছি না, তাই একে আমি চাবুক মেরে ছেড়ে দেব।”

23কিন্তু তারা প্রচণ্ড চিৎকার করেই চলল, তাঁকে যেন ক্রুশে দেওয়া হয়, এই দাবিতে তারা অনড় থাকল। আর শেষ পর্যন্ত তাদের চিৎকারেরই জয় হল। 24পীলাত তাদের অনুরোধ রক্ষা করবেন বলে ঠিক করলেন। 25যাকে বিদ্রোহ ও খুনের অপরাধে কারাগারে রাখা হয়েছিল তাকেই তিনি মুক্তি দিলেন, আর যীশুকে তাদের হাতে তুলে দিলেন যেন তাকে নিয়ে তারা যা চায় তা করতে পারে।

যীশুকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হল

(মথি 27:32-44; মার্ক 15:21-32; যোহন 19:17-27)

26তারা যখন যীশুকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন কুরীশীর শহরের শিমোন নামে একজন লোককে সৈন্যরা ধরল, সে তখন মাঠ থেকে আসছিল। তারা সেই ক্রুশটা তার ঘাড়ে চাপিয়ে যীশুর পেছনে পেছনে সেটা বয়ে নিয়ে যেতে তাকে বাধ্য করল।

27এক বিরাট জনতা তার পেছনে পেছনে যাচ্ছিল, তাদের মধ্যে কিছু স্ত্রীলোকও ছিল যাঁরা যীশুর জন্য কান্নাকাটি ও হা-হুতাশ করতে করতে যাচ্ছিল। 28যীশু তাদের দিকে ফিরে বললেন, “হে জেরুশালেমের মেয়েরা, তোমরা আমার জন্য কেঁদো না, বরং নিজেদের জন্য ও তোমাদের সন্তানদের জন্য কাঁদ। 29কারণ এমন দিন আসছে যখন লোকে বলবে, ‘বন্ধ্যা স্ত্রীলোকেরাই ধন্য! আর ধন্য সেই সব গর্ভ যা কখনও সন্তান প্রসব করে নি, ধন্য সেই সব স্তন যা কখনও শিশুদের পান করায় নি।’ 30সেই সময় লোকে পর্বতকে বলবে, ‘আমাদের ওপরে পড়!’+ 23:30 উদ্ধৃতি হোশেয় 10:8. তারা ছোট ছোট পাহাড়কে বলবে, ‘আমাদের চাপা দাও!’ 31কারণ গাছ সবুজ থাকতেই যদি লোকে এরকম করে, তবে গাছ যখন শুকিয়ে যাবে তখন কি করবে?”

32দুজন অপরাধীকে তাঁর সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওযা হচ্ছিল। 33তারা “মাথার খুলি” নামে একটা জায়গায় এসে পৌঁছাল, সেখানে ঐ দুজন অপরাধীর সঙ্গে তারা যীশুকে ক্রুশে বিদ্ধ করল। তারা একজনকে তাঁর বাঁদিকে, আর অন্যজনকে তাঁর ডানদিকে ক্রুশে টাঙিয়ে দিল।

34তখন যীশু বললেন, “পিতা, এদের ক্ষমা কর, কারণ এরা যে কি করছে তা জানে না।”

তারা পাশার ঘুঁটি চেলে গুলিবাঁট করে নিজেদের মধ্যে তাঁর পোশাকগুলি ভাগ করে নিল। 35লোকেরা সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল, ইহুদী নেতারা ব্যঙ্গ করে তাঁকে বলতে লাগল, “ওতো অন্যদের বাঁচাতো। ও যদি ঈশ্বরের মনোনীত সেই খ্রীষ্ট হয় তবে এখন নিজেকে বাঁচাক দেখি!”

36সৈন্যরাও তাঁর কাছে এগিয়ে এসে তাঁকে উপহাস করতে লাগল। তারা পান করার সিরকা এগিয়ে দিয়ে যীশুকে বলল, 37“তুই যদি ইহুদীদের রাজা, তবে নিজেকে বাঁচা দেখি!” 38(তারা একটা ফলকে “এ ইহুদীদের রাজা” লিখে যীশুর ক্রুশের ওপর তা লটকে দিল।)

39তাঁর দুপাশে যাঁরা ক্রুশের ওপর ঝুলছিল, তাদের মধ্যে একজন তাঁকে বিদ্রূপ করে বলল, “তুমি না খ্রীষ্ট? আমাদের ও নিজেকে বাঁচাও দেখি!”

40কিন্তু অন্য জন তাকে ধমক দিয়ে বলল, “তুমি কি ঈশ্বরকে ভয় কর না? তুমি তো একই রকম শাস্তি পাচ্ছ। 41আমরা যে শাস্তি পাচ্ছি তা ন্যায়, কারণ আমরা যা করেছি তার যোগ্য শাস্তিই পাচ্ছি; কিন্তু ইনি তো কোন অন্যায় করেন নি।” 42এরপর সে বলল, “যীশু আপনি যখন আপনার রাজ্যে আসবেন তখন আমার কথা মনে রাখবেন।”

43যীশু তাকে বললেন, “আমি তোমায় সত্যি বলছি, তুমি আজকেই আমার সঙ্গে পরমদেশে উপস্থিত হবে।”

যীশুর মৃত্যুবরণ

(মথি 27:45-56; মার্ক 15:33-41; যোহন 19:28-30)

44তখন বেলা প্রায় বারোটা; আর সেই সময় থেকে তিনটা পর্যন্ত সমস্ত দেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেল। 45সেই সময় সূর্যের আলো দেখা গেল না; আর মন্দিরের মধ্যে ভারী পর্দাটা মাঝখানে থেকে চিরে দুভাগ হয়ে গেল। 46যীশু চিৎকার করে বললেন, “পিতা আমি তোমার হাতে আমার আত্মাকে সঁপে দিচ্ছি।” এই কথা বলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন।

47সেখানে উপস্থিত শতপতি এইসব ঘটনা দেখে ঈশ্বরের প্রশংসা করে বলে উঠলেন, “ইনি সত্যিই নির্দোষ ছিলেন!”

48যে লোকরা সেখানে জড়ো হয়েছিল, তারা এইসব ঘটনা দেখে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে সেখান থেকে চলে গেল। 49কিন্তু যাঁরা যীশুর খুবই পরিচিত ছিলেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত কি ঘটে দেখার জন্য দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন।যে সব স্ত্রীলোক গালীল থেকে যীশুর সঙ্গে এসেছিলেন, তাঁরাও এদের মধ্যে ছিলেন।

আরিমাথিয়ার যোষেফ

(মথি 27:57-61; মার্ক 15:42-47; যোহন 19:38-42)

50 সেখানে যোষেফ নামে একজন লোক ছিলেন, তিনি ছিলেন ইহুদী মহাসভার সভ্য; ভাল ও দয়ালু ব্যক্তি। তিনি পরিষদের সিদ্ধান্ত ও কার্যকলাপের সঙ্গে একমত হননি। যিহূদার আরিমাথিয়ার শহর থেকে তিনি এসেছিলেন এবং ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণের প্রতীক্ষায় ছিলেন। 52যোষেফ পীলাতের কাছে গিয়ে যীশুর মৃতদেহটি চাইলেন। 53পরে যীশুর দেহটি ক্রুশের ওপর থেকে নামিয়ে নিয়ে একটি মসলিন কাপড়ে তা জড়ালেন। এরপর পাহাড়ের গা কেটে গর্ত করা একটি সমাধিগুহার মধ্যে দেহটি শুইয়ে রাখলেন। এই সমাধি সম্পূর্ণ নতুন ছিল, এর আগে কাউকে কখনও এখনে কবর দেওয়া হয় নি। 54সেই দিনটা ছিল বিশ্রামবারের আয়োজনের দিন, আর বিশ্রামবার প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছিল।

55যে স্ত্রীলোকেরা যীশুর সঙ্গে সঙ্গে গালীল থেকে এসেছিলেন, তাঁরা যোষেফের সঙ্গে গেলেন, আর সেই সমাধিটি ও তার মধ্যে কিভাবে যীশুর দেহ শায়িত রাখা হল তা দেখলেন। 56এরপর তাঁরা বাড়ি ফিরে গিয়ে বিশেষ এক ধরণের সুগন্ধি তেল ও মশলা তৈরী করলেন।

বিশ্রামবারে তাঁরা বিধি-ব্যবস্থা অনুসারে কাজকর্ম বন্ধ রাখলেন।

24

যীশুর পুনরুত্থানের সংবাদ

(মথি 28:1-10; মার্ক 16:1-8; যোহন 20:1-10)

1সপ্তাহের প্রথম দিন, সেই স্ত্রীলোকরা খুব ভোরে ঐ সমাধিস্থলে এলেন। তাঁরা যে গন্ধদ্রব্য ও মশলা তৈরী করেছিলেন তা সঙ্গে আনলেন। 2তাঁরা দেখলেন সমাধিগুহার মুখ থেকে পাথরখানা একপাশে গড়িয়ে দেওয়া আছে; 3কিন্তু ভেতরে ঢুকে সেখানে প্রভু যীশুর দেহ দেখতে পেলেন না। 4তাঁরা যখন অবাক বিস্ময়ে সেই কথা ভাবছেন, সেই সময় উজ্জ্বল পোশাক পরে দুজন ব্যক্তি হঠাৎ‌ এসে তাঁদের পাশে দাঁড়ালেন। 5ভয়ে তাঁরা মুখ নীচু করে নতজানু হয়ে রইলেন। ঐ দুজন তাঁদের বললেন, “যিনি জীবিত, তোমরা তাঁকে মৃতদের মাঝে খুঁজছ কেন? 6তিনি এখানে নেই, তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন। তিনি যখন গালীলে ছিলেন তখন তোমাদের কি বলেছিলেন মনে করে দেখ।” 7তিনি বলেছিলেন, “মানবপুত্রকে অবশ্যই পাপী মানুষদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে, তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হবে; আর তিন দিনের দিন তিনি আবার মৃত্যুর মধ্য থেকে জীবিত হয়ে উঠবেন।” 8তখন যীশুর সব কথা তাঁদের মনে পড়ে গেল।

9তারপর তাঁরা সমাধিগুহা থেকে ফিরে এসে সেই এগারো জন প্রেরিতকে ও তাঁর অনুগামীদের এই ঘটনার কথা জানালেন। 10এই স্ত্রীলোকরা হলেন মরিয়ম মগ্দলীনী, যোহানা আর যাকোবের মা মরিয়ম। তাঁদের সঙ্গে আরো কয়েকজন এইসব ঘটনা প্রেরিতদের জানালেন। 11কিন্তু প্রেরিতদের কাছে সে সব প্রলাপ বলে মনে হল, তাঁরা সেই স্ত্রীলোকদের কথা বিশ্বাস করলেন না। 12কিন্তু পিতর উঠে দৌড়ে সমাধিগুহার কাছে গেলেন। তিনি নীচু হয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখলেন, কেবল যীশুর দেহে জড়ানো কাপড়গুলো সেখানে পড়ে আছে; আর যা ঘটেছে তাতে আশ্চর্য হয়ে ঘরে ফিরে গেলেন।

ইম্মায়ুর পথে

(মার্ক 16:12-13)

13ঐ দিনই দুজন অনুগামী জেরুশালেম থেকে সাত মাইল দূরে ইম্মায়ু নামে একটি গ্রামে যাচ্ছিলেন। 14এই যে সব ঘটনাগুলি ঘটে গেল, যেতে যেতে তাঁরা সে বিষয়েই পরস্পর আলোচনা করছিলেন। 15তাঁরা যখন এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন, এমন সময় যীশু নিজে এসে তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগলেন। 16(ঘটনাটি এমনভাবেই ঘটল যাতে তাঁরা যীশুকে চিনতে না পারেন।) 17যীশু তাঁদের বললেন, “তোমরা যেতে যেতে পরস্পর কি নিয়ে আলোচনা করছ?”

তাঁরা থমকে দাঁড়ালেন, তাঁদের খুবই বিষন্ন দেখাচ্ছিল। 18তাঁদের মধ্যে ক্লিয়পা নামে একজন তাঁকে বললেন, “জেরুশালেমের অধিবাসীদের মধ্যে আমাদের মনে হয় আপনিই একমাত্র লোক, যিনি জানেন না গত কদিনে সেখানে কি কাণ্ডটাই না ঘটে গেছে।”

19যীশু তাঁদের বললেন, “কি ঘটেছে, তোমরা কিসের কথা বলছ?”

তাঁরা যীশুকে বললেন, “নাসরতীয় যীশুর বিষয়ে বলছি। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি তাঁর কথা ও কাজের শক্তিতে ঈশ্বর ও সমস্ত মানুষের চোখে নিজেকে এক মহান ভাববাদীরূপে প্রমাণ করেছেন। 20কিন্তু আমাদের প্রধান যাজকরা ও নেতারা তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেবার জন্য ধরিয়ে দিল, তারা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে মারল। 21আমরা আশা করেছিলাম যে তিনিই সেই যিনি ইস্রায়েলকে মুক্ত করবেন।

“কেবল তাই নয়, আজ তিন দিন হল এসব ঘটে গেছে। 22আবার আমাদের মধ্যে কয়েকজন স্ত্রীলোক আমাদের অবাক করে দিলেন। তাঁরা আজ খুব ভোরে সমাধির কাছে গিয়েছিলেন; 23কিন্তু সেখানে তাঁরা যীশুর দেহ দেখতে পান নি। সেখান থেকে ফিরে এসে তাঁরা আমাদের বললেন যে তাঁরা স্বর্গদূতদের দর্শন পেয়েছেন, আর সেই স্বর্গদূতরা তাঁদের বলেছেন যে যীশু জীবিত। 24এরপর আমাদের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন সেই সমাধির কাছে গিয়েছিলেন; আর তাঁরা দেখলেন স্ত্রীলোকরা যা বলেছেন তা সত্য। তাঁরা যীশুকে সেখানে দেখতে পান নি।”

25তখন যীশু তাঁদের বললেন, “তোমরা সত্যি কিছু বোঝ না, তোমাদের মন বড়ই অসাড়, তাই ভাববাদীরা যা কিছু বলে গেছেন তোমরা তা বিশ্বাস করতে পার না। 26খ্রীষ্টের মহিমায় প্রবেশ লাভের পূর্বে কি তাঁর এইসব কষ্টভোগ করার একান্ত প্রয়োজন ছিল না?” 27আর তিনি মোশির পুস্তক থেকে শুরু করে ভাববাদীদের পুস্তকে তাঁর বিষয়ে যা যা লেখা আছে, শাস্ত্রের সে সব কথা তাঁদের বুঝিয়ে দিলেন।

28তাঁরা যে গ্রামে যাচ্ছিলেন তার কাছাকাছি এলে পর যীশু আরো দূরে যাবার ভাব দেখালেন। 29তখন তাঁরা যীশুকে খুব অনুরোধ করে বললেন, “দেখুন, বেলা পড়ে গেছে, এখন সন্ধ্যা হয়ে এল, আপনি আমাদের এখানে থেকে যান।” তাই তিনি তাঁদের সঙ্গে থাকবার জন্য ভেতরে গেলেন।

30তিনি যখন তাঁদের সঙ্গে খেতে বসলেন, তখন রুটি নিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। পরে সেই রুটি টুকরো টুকরো করে তাঁদের দিলেন। 31সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের চোখ খুলে গেল, তাঁরা যীশুকে চিনতে পারলেন, আর তিনি সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। 32তখন তাঁরা পরস্পর বলাবলি করলেন, “তিনি যখন রাস্তায় আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন ও শাস্ত্র থেকে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন আমাদের অন্তর কি আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে নি?”

33তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে জেরুশালেমে গেলেন। সেখানে তাঁরা সেই এগারোজন প্রেরিত ও তাঁদের সঙ্গে আরো অনেককে দেখতে পেলেন। 34প্রেরিত ও অন্যান্য যাঁরা সেখানে ছিলেন তাঁরা বললেন, “প্রভু, সত্যি জীবিত হয়ে উঠেছেন। তিনি শিমোনকে দেখা দিয়েছেন।”

35তখন সেই দুজন অনুগামীও রাস্তায় যা ঘটেছিল তা তাঁদের কাছে ব্যক্ত করলেন। আর যীশু যখন রুটি টুকরো টুকরো করছিলেন তখন কিভাবে তাঁরা তাঁকে চিনতে পারলেন তাও জানালেন।

অনুগামীদের সামনে যীশুর আবির্ভাব

(মথি 28:16-20; মার্ক 16:14-18; যোহন 20:19-23; প্রেরিত 1:6-8)

36তাঁরা যখন এসব কথা তাদের বলছেন, এমন সময় যীশু তাঁদের মাঝে এসে দাঁড়ালেন আর বললেন, “তোমাদের শান্তি হোক্!”

37কিন্তু তাঁরা ভয়ে চমকে উঠলেন। তাঁরা মনে করলেন বোধ হয় কোন ভূত দেখছেন। 38কিন্তু যীশু তাঁদের বললেন, “তোমরা এত অস্থির হচ্ছ কেন? আর তোমাদের মনে সন্দেহই বা জাগছে কেন? 39আমার হাত ও পা দেখ, আমায় স্পর্শ করে দেখ, আত্মার এইরূপ হাড় মাংস থাকে না, কিন্তু তোমরা দেখতে পাচ্ছ আমার আছে।”

40এই কথা বলে তিনি তাঁদের হাত ও পা দেখালেন। 41তাঁদের এতই আনন্দ হয়েছিল যে তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাঁরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। যীশু তাঁদের বললেন, “তোমাদের কাছে কিছু খাবার আছে কি?” 42তাঁরা তাঁকে এক টুকরো ভাজা মাছ দিলেন। 43তিনি সেটি নিয়ে তাঁদের সামনে গেলেন।

44তিনি তাঁদের বললেন, “আমি যখন তোমাদের সঙ্গে ছিলাম, তখনই তোমাদের এসব কথা বলেছিলাম, আমার সম্বন্ধে মোশির বিধি-ব্যবস্থায়, ভাববাদীদের পুস্তকে ও গীতসংহিতায় যা কিছু লেখা হয়েছে তা পূর্ণ হতেই হবে।”

45এরপর তিনি তাঁদের বুদ্ধি খুলে দিলেন, যেন তাঁরা শাস্ত্রের কথা বুঝতে পারেন। 46যীশু তাঁদের বললেন, “একথা লেখা আছে, খ্রীষ্টকে অবশ্যই কষ্ট ভোগ করতে হবে, আর তিনি মৃত্যুর তিন দিনের দিন মৃতদের মধ্য থেকে জীবিত হয়ে উঠবেন। 47 এবং পাপের জন্য অনুশোচনা ও পাপের ক্ষমার কথা অবশ্যই সমস্ত জাতির কাছে ঘোষণা করা হবে। জেরুশালেম থেকেই একাজ শুরু হবে আর তোমরাই এসবের সাক্ষী। 49আমার পিতা যা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমি তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেব; কিন্তু তোমরা যে পর্যন্ত না উর্দ্ধ থেকে আসা শক্তি পরিধান করছ, সেই পর্যন্ত এই শহরেই থাক।”

যীশুর স্বর্গে প্রত্যাবর্তন

(মার্ক 16:19-20; প্রেরিত 1:9-11)

50এরপর যীশু তাঁদের বৈথনিয়া পর্যন্ত নিয়ে গেলেন এবং হাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করলেন। 51তিনি আশীর্বাদ করতে করতে তাঁদের ছেড়ে আকাশে উঠে যেতে লাগলেন আর স্বর্গে উন্নীত হলেন। 52শিষ্যরা যীশুকে প্রণাম জানিয়ে মহানন্দের সঙ্গে জেরুশালেমে ফিরে গেলেন। 53আর সর্বক্ষণ মন্দিরে উপস্থিত থেকে ঈশ্বরের প্রশংসা করতে লাগলেন।